Click Below

Breaking

Know more

Search

বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২১

ভারতের আধুনিক শিক্ষার বিকাশে সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষা সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা আলোচনা করো।

 












প্রশ্ন,

ভারতের আধুনিক শিক্ষার বিকাশে সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষা সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা আলোচনা করো।

অথবা

ভারতবর্ষের সমাজ সংস্কারক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান।

ভূমিকা- আধুনিক বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে সমস্ত মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে তার ভিতরে অন্যতম ছিল রাজা রামমোহন রায়।আধুনিক যুগে প্রবেশ করেও ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতা যখন- অশিক্ষা, অসামাজিকতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে ছিল, ঠিক তখনই আবির্ভাব ঘটে ভারত পথিক রামমোহন রায়ের এবং তখন তিনি সমগ্র জাতিকে আলোর পথ দেখান। এই জন্য তাকে "ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত ; ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষআধুনিক ভারতের ইরাসমাস" উপাধি দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে বিপিনচন্দ্র পাল বলেছেন- 
“ভারতবর্ষের শিক্ষার ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায় আধুনিকতার অগ্রদূত"।


প্রথম জীবন- রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ২২ মে ১৭৭২(মতান্তরে ১৭৭৪) খ্রিস্টাব্দে হুগলি জেলার অন্তর্গত রাধানগর গ্রামে, এক  বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর পিতার নাম ছিল রমাকান্ত রায়, মাতার নাম তারিণী দেবী। বাল্যকাল থেকেই তিনি আরবি, ফরাসি, বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন বিদেশি ভাষা ও বিদেশি দার্শনিকদের চিন্তা-ধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।


 • ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়কে বলা হয় ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ। তৎকালীন রাজনীতি,জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন- সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য।


•শিক্ষাসংস্কারক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা-

রাজা রামমোহন রায় যেমন সমাজসংস্কার তেমনি তিনি শিক্ষাসংস্কারক। তিনি বিশ্বাস করতেন 'শিক্ষাই' ছিল এমন এক প্রকার বিষয়, যা সমগ্র জাতি থেকে কুসংস্কারকে মুক্ত করতে পারে। জাতি থেকে কুসংস্কার ও জড়তা মুক্ত করতে তিনি এই জন্য প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সুশিক্ষার প্রসার ঘটাতে চেয়ে ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা সংস্কার গুলি হল-

১) শিক্ষার লক্ষ্য- রাজা রামমোহন রায় শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় দিকগুলিকে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। এর সাথেই তিনি ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট দিকগুলিকে সংরক্ষণ করে জনগণের নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।রামমোহন রায় মনে করতেন শিক্ষার লক্ষ্য হবে ব্যক্তি ও সমাজকল্যাণ। শিক্ষার মাধ্যমে যাতে শিশুর চিন্তা ভাবনা ও যুক্তিবাদী মনের বিকাশ ঘটে। শিক্ষার মাধ্যমে তিনি মানুষের মনে পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা - রামমােহন রায় ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠাতে তিনি ছিলেন ডেভিড হেয়ারের সহযোগী।১৮২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজ ব্যয়ে অ্যাংলাে হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় ১৮২৬ সালে রামমােহন প্রতিষ্ঠিত বেদান্ত কলেজে পাশ্চাত্য সমাজ বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় শিক্ষা দেওয়া হত। এমনকি আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতায় জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে তিনি ডাফকে সাহায্য করেছিলেন। 

৩) পাশ্চাত্য শিক্ষার বিকাশ-  রামমােহন ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে পুরােপুরি সমর্থন জানান। এই জন্য তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেদান্ত কলেজে পাশ্চাত্য ধারায় সমাজবিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই নতুন ভারত গড়ে উঠবে। এই উদ্দেশ্য তিনি একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। পাশাপাশি লর্ড আর্মহাস্টকে  ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে একটি চিঠি লিখে ভারতবাসীর জন্য পাশ্চাত্য গনিত, বিজ্ঞান, রসায়ন, পাশ্চাত্য দর্শন এবং ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় শিক্ষার দাবী জানান।

৪) স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার -
স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে রামমোহন রায় যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন । ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ‘সংক্ষিপ্ত মন্তব্য’ নামক বই – এ নারীদের প্রাচীন অধিকারের বর্তমান সংকোচনের ওপর তিনি আলোকপাত করেন। এতে তিনি ভারতের হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে অতি প্রাচীনকালেও নারীশিক্ষার প্রচলিত ছিল এবং সমাজে তাঁরা বিশেষ মর্যাদা পেতেন। পরবর্তী যুগে নারীদের শিক্ষার অধিকার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়, তাই আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রতিভূ রামমোহন নারীদের শিক্ষার অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হন যা এই বইটিতে যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরেন। এর পদক্ষেপ হিসেবে তিনি নারীশিক্ষাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং অন্যেদের ও আহ্বান করেছিলেন।

৫) সংবাদপত্র প্রকাশের মাধ্যমে জনশিক্ষা প্রসার -
সংবাদপত্র প্রকাশের মাধ্যমে জনশিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা করেছিলেন রামমোহন রায়। তিনি মনে করতেন শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত পথের সন্ধান দিতে পারে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলি হল- ‘ সম্বাদ কৌমুদী’, ‘মিরাত-উল-আকবর’, ‘The Brahmanical Magazine’, ইত্যাদি। এই সমস্ত পত্রিকাগুলিতে তৎকালীন সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ ও আলোচনা থাকত। এছাড়া জনসাধারণের কল্যাণসাধন ও জনমত গঠনের ক্ষত্রেও পত্রপত্রিকাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

•সমাজ সংস্কারক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা-

১) ধর্মীয় সংস্কার- রাজা রামমোহন রায় সমাজের ধর্মীয় দিকটি সংস্করনের জন্য একান্তই উদ্যোগী পরায়ন ছিল। তিনি জাতিভেদ প্রথা,সংকীর্ণতা, দুর্নীতি, কুসংস্কার রাজা রামমােহনকে ব্যথিত করেছিল। তার কাছে হিন্দু সমাজের প্রচলিত আচার অনুষ্ঠান সর্বস্ব পৌত্তলিকতা,পুরােহিততন্ত্র, কুসংস্কার লােকাচার রামমােহনের কাছে সব অর্থহীন ছিল।

তিনি নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা ও
একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।তিনি বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে বলেন ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি
খ্রিস্ট ধর্মের কুসংস্কারগুলিকেও
সমালােচনা করতে ছাড়েননি। ১৮০৩
সালে বহুদেবতাবাদের বিরুদ্ধে এবং
একেশ্বরবাদের সমর্থনে ফার্সি ভাষায়
'তুহাফৎ উন্মুয়াহেদ্দিন' নামক একটি
পুস্তিকা প্রকাশ করেন।

২) সতীদাহ প্রথা নিবারণ -
 আমাদের দেশে তখন ভয়ঙ্কর কুপ্রথা ‘সতীদাহ প্রথা’ প্রচলিত ছিল । রামমোহন রায় প্রথম উদ্যোগ নিয়ে উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এর বদান্যতায় ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিবারণ আইন পাশ করান। রামমোহনের সহযোগিতায় ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন।

৩)কৌলিন্য প্রথার বিরোধিতা-কৌলিন্য প্রথা এবং গঙ্গায় সন্তান বিসর্জনের বিরুদ্ধে তিনি সরব হন। এছাড়াও হিন্দুসমজের জাতপাত এবং অযৌক্তিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

৪) বহুবিবাহ বাল্যববাহের প্রতিবাদ -
বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের তীব্র প্রতিবাদ করেন রামমোহন রায় । তিনি নিয়মিত যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সংবাপত্রের পাতায় তার মতকে প্রতিষ্ঠিত করে জনমত গড়ে তোলেন।

৫) সমাজে নারীর সমান অধিকার-
 সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে তিনি নারীকেও সমান অধিকার দেবার পক্ষে আন্দোলন করেন। সর্বত্রই নারী পুরুষের সাম্য ও অধিকারের সমতার দ্বারা সামাজিক উন্নয়নের পথটিকে তিনি উপলব্ধি করেন ।

৬) আত্মীয়সভা ও ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা- 
মানুষের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ও নিজের ধর্মভাবনা সম্পর্কে আলােচনার উদ্দেশ্য ১৮১৫ সালে আত্মীয়সভা এবং ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে উপাসনায় যােগ দিতে পারতাে।

৭)কুপ্রথার বা কুসংস্কারের বিরোধিতা- রামমোহন রায় উপলব্ধি করেন সামাজিক সংস্কারের জন্য চাই শিক্ষা বিস্তার ও জনসচেতনতা। তাই তিনি সংবাদপত্র প্রকাশ করে যুক্তির মাধ্যমে সমাজের কুপ্রথার বিরোধিতা করেন। যেমন- সরকারি চাকুরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এছাড়াও তিনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে যেমন তুলে ধরেন, তেমনি সমাজে এক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলে যুগের গতিকে ত্বরান্বিত করেন ।


 রামমোহনের হাত ধরেই ভারতবর্ষ আধুনিক যুগে পা রেখেছিল। রামমোহনের জীবনীকার সোফিয়া-ডি-কোলেট সংস্কারক রামমোহনের মূল্যায়নে লিখেছিলেন-
 "ইতিহাসে রামমোহন হলেন এক জীবন্ত সেতু, যার ওপর দিয়ে ভারতবর্ষ তার বিশাল অতীত থেকে অসীম ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হয়েছে।” 

শেষ পর্যন্ত মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটেনের ব্রিস্টলে ১৮৩৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর রাজা রামমোহন রায়ের জীবনাসন ঘটে।

উপসংহারঃ সমাজ সংস্কারক হিসাবে
রাজা রামমােহনের কিছু সীমাবদ্ধতা
থাকলেও আধুনিক ভারতীয় সমাজ ও
সভ্যতায় তার অবদান অনস্বীকার্য বলে
মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে,
রামমােহন রায় ভারতে আধুনিক
যুগের সূচনা করেন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজা রামমোহন রায় কে 'ভারত পথিক' এবং দিলীপ কুমার দে 'বিশ্বপথিক' বলে অভিহিত করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here