প্রশ্ন,
বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের ভূমিকা আলোচনা কর।
অথবা
মার্কিন পুলিশ ব্যবস্থার বিবরণ দাও।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করেছিল, তা হল দ্বিমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার অবস্থান এবং অনিবার্য ফল হিসেবে গড়ে ওঠা একমেরু বিশ্বের ধারণা। এই নতুন রাজনৈতিক পরিকাঠামোতে একমাত্র "সুপার পাওয়ার" হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী হয়ে ওঠে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে মার্কিন শক্তি তার সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক ও বেসামরিক জোট গঠন করে। বিশেষ সকল স্থান থেকে গোয়েন্দার মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ, IMF, বিশ্ব ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলিকে চীনের নিয়ন্ত্রণে এনে মার্কিন শক্তি বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে অধিপত্য স্থাপনের সুযোগ পায় এবং আমেরিকা " global policeman"-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
বিশ্বের পুলিশ ম্যান হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসিনীতি গ্রহণ করেন। উপসাগরীয় যুদ্ধ মার্কিন শক্তির ইরাক আক্রমণ, সাদ্দাম হোসেনের পতনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন শক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্য এশিয়ার তৈল ভান্ডারের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ব্রুসের পরামর্শদাতা অভিষ্ট লক্ষ্য সাধন তৈরি করেন, 1997 সালের দলিল - "project to the new American century", দলিলে স্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে আমেরিকার হয়ে বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আধিপত্য কারী একমাত্র শক্তি আর এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের কোনো শক্তি যাতে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য মার্কিন শক্তি বিভিন্ন ব্যাখ্যা গ্রহণে তৎপর হন। আমেরিকা প্রমান করতে তৎপর হন। আমেরিকা প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো পরিবর্তনে তাকে বাদ দিলে হবেনা। মার্কিন নির্দেশে বিশ্বের রাজনীতি চলবে, যে শক্তি তার স্বার্থের প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করবে তাকে মার্কিন আগ্রাসনের শিকার হতে হবে। এই নীতি অনুযায়ী ইরাক, লাওস, চিলি, সুদান, আফগানিস্তান মার্কিন আগ্রসনের শিকারে পরিণত হয়।
2001 সালে 11 ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সংস্থার বিমান হানা ঘটেছিল। সন্ত্রাসবাদীদের ওই বিমান হানা মার্কিন আগ্রাসনকে তীব্র করে তোলার সুযোগ দিয়েছিল। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীদের করা হাতে মোকাবিলা করার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি বুশ - ইরাক ও আফগানিস্তানকে আক্রমণ করেছিল। 2002 সালে মার্কিন কংগ্রেসের নতুন নীতি ও রণকৌশল পেশ করেছিলেন জর্জ বুশ। এই দলিলে উল্লেখিত হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপদস্তের শাসন যেখানে আছে সেই শাসন পরিবর্তন করে সেখানে মার্কিন স্বার্থবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মার্কিন একাধিকত্তের বিরুদ্ধে যাতে কোন প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে তার জন্য আমেরিকা - ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ করেন। এর পিছনে অজুহাত ছিল ইরাক সন্ত্রাসবাদীদের মজুদ দাতা এবং সেখানে জীবাণু বোমা মজুদ আছে। জাতিপুঞ্জের অনুসন্ধানকারীর দল এব্যাপারে অনুসন্ধান কমিশনের তথ্যকে নিজের মতো সাজিয়ে ইরাক কে দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতা যুদ্ধ করে এবং নূর আলীর নেতৃত্বে গোপন সরকার গঠন করে।
সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বুশ প্রশাসন আফগানিস্তান আক্রমণ করে। বারবাক কাঁরমালের নেতৃত্বে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে সন্ত্রাসবাদীদের বিরোধিতার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীকে আমেরিকার সাহায্য দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আফগান গোষ্ঠীগুলি নাশকতামূলক কাজ করলে আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মার্কিন অর্থে 9 লক্ষ মোজাহিদ সেনাকে পাকিস্তানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। মার্কিনদের সাহায্যে সৌদি আরবে মোজাহিদ ওসামা বিন লাদেনের সাথে সৌদি আফগানদের যোগাযোগ হয়। আফগান যুবক মোল্লা মহম্মদের নেতৃত্বে মার্কিন সাহায্য আফগানিস্তানের মাদ্রাসা গুলিতে ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। লাদেনের সহায়তায় মার্কিন প্রশাসন আফগানিস্তানে নিজেদের ঘাঁটি তৈরি করতে সক্ষম হয়। সাম্যবাদী আফগান শাসকের কুশাসনের পতন ঘটে। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে মার্কিন শক্তি চীন, পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলির উপর নির্যাতন কায়েম করতে উদ্যোগী হয়। ক্রমে মার্কিন ও লাদেনের সম্পর্কে ভাঙ্গন দেখা যায়। তাই তাকে ধরার জন্য 2001 সালে 17ই অক্টোবর আফগানিস্তানের উপর বিমান হানা দেয়। ফলে আফগানিস্তান ধ্বংস হয়।
শুধু আফগানিস্তান ও ইরাক নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ও ইরান মার্কিন অগ্রেশনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সিরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এই মুশকিল দেশ জোট মার্কিন বিরোধী সন্ত্রাসবাদী ইরাক গরিলাদের আশ্রয় দিয়েছেন এবং ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে তার অস্ত্র সম্ভার বাড়িয়ে চলেছে। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযোগ ছিল - ইরান পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার গোপন প্রয়াস করছে। ইরান শান্তিপূর্ণভাবে পরমাণু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই অভিযোগে ইরানের উপর আমেরিকা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
এছাড়া ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে কিউবা কে শায়েস্তা করার নতুন কৌশল রচনা করেছিল। আমেরিকা 2006 সালে জুন মাসে কিউবা বামপন্থী ফিদেল কাস্তের অসুস্থতার সুযোগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি কিউবায় অভ্যুত্থানের ডাক দেয়। কিউবা জনগণ তাতে সায় দেয়নি। ফিদেল কাস্তের ভ্রাতা শক্ত হাতে দেশের হাল ধরে ও পোল্যান্ডের সহযোগিতায় আমেরিকা কে সরে যাওয়ার কথা বলেন। তাই সেখানে মার্কিন অধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব গোলার্ধে আক্রমণের আশঙ্কায় দিন গুনছিল। এই দেশটি গোপনে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করেছে। এই অভিযোগে মার্কিন রাষ্ট্র সেখানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন তৃতীয় বিশ্বের অভ্যন্তরীণ কলহ, নির্জট আন্দোলনের দুর্বলতা ইতালিতে পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে আমেরিকা police man - এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মার্কিন দপ্তর ঘোষণা করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে নিজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক শক্তিকে ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারবে। বস্তুতপক্ষে বর্তমান বিশ্বে পরিস্থিতির বাস্তবতা বিচার করলে দেখা যায় - Global policeman - এর সামরিক ক্ষমতা কর্তৃত্বকে উপেক্ষা করার সাহস কোনো দেশেরই নেই।
আরো পড়ুন:- দাঁতাত কি? দাঁতাত গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর? CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন