প্রশ্ন,
ইঙ্গ জাপান চুক্তির গুরুত্ব/ ফলাফল/ তাৎপর্য আলোচনা কর?
ইংল্যান্ড ও জাপানের মধ্যে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত চুক্তি ইঙ্গ জাপান চুক্তি নামে পরিচিত। এশিয়া, ইউরোপ তথা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এই চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বিশেষত এর গুরুত্ব আলোচনা করার আগে শর্তগুলো জানা দরকার -
ইঙ্গ জাপান চুক্তির শর্ত:-
১) ইঙ্গ জাপান চুক্তিতে স্থির হয় যে ইংল্যান্ড ও জাপান দূরপ্রাচ্যের স্থিতাবস্তা বজায় রাখতে স্বীকৃত হবে।
২) উভয় রাষ্ট্রই চীন ও রাশিয়ার স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা বজায় রাখতে চায়, যাতে এই দুই রাষ্ট্রের সকল দেশের সমান সুযোগ থাকে।
৩) জাপান ও ইংল্যান্ডের মধ্যে সমতার ভিত্তি বজায় থাকবে।
৪) চীন ও রাশিয়া উভয় দেশের সমতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক অধিকার বজায় থাকবে।
৫) ইংল্যান্ড ও জাপানের স্বার্থ হবে অনাক্রমণ ।
৬) ইংল্যান্ড ও জাপান উভয় রাষ্ট্রই আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সাহায্য করবে।
৭) ইংল্যান্ড ও জাপানের মধ্যে কোন একটি রাষ্ট্র যদি নিজের স্বার্থের জন্য অন্য বিপক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাহলে মৈত্রী চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্য রাষ্ট্রটি নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু অন্যথায় যদি রাষ্ট্রকে সাহায্য করে তাহলে ইংল্যান্ড ও জাপান উভয় রাষ্ট্রের যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে।
• ইঙ্গ জাপান চুক্তির গুরুত্ব/ ফলাফল/ তাৎপর্য:-
প্রথমত, সুদূর প্রাচ্য অপূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত ইঙ্গ জাপান মৈত্রী চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে রাশিয়াকে প্রতিহত করার প্রচেষ্টা ইংল্যান্ড ও জাপান মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। জাপান যদি রাশিয়াকে প্রতিহত করতে না পারে তাহলে জাপান রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। তখন ইংল্যান্ডের কর্তব্য হবে রাশিয়া যাতে অপর কোন রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনরকম সাহায্য না পায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। বস্তুত ইঙ্গ জাপান কূটনীতির এক বিশেষ পদক্ষেপ ছিল মৈত্রী ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে জাপানের আন্তর্জাতিক স্তরে রাজনৈতিক মর্যাদা বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। সুদূর প্রাচ্যের রাজনীতিতে বৃটেনের সমর্থন পাওয়ার ফলে জাপানের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের কোন বাধা রইল না। ইংল্যান্ডের সহায়তায় জাপানের নৌ শক্তির বিকাশে সামরিক নৌ বল বৃদ্ধি করে। ইংল্যান্ডের সমর্থনপুষ্ট হয়ে জাপান নির্দ্বিধায় রাশিয়ার মোকাবিলা করতে সাহসী হয়। ইঙ্গ জাপান মৈত্রী স্থাপনের ফলে রাশিয়াকে সমর্থন করতে অন্য দেশ এগিয়ে আসেনি। তাছাড়া মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী ইংল্যান্ডের দায়িত্ব ছিল রাশিয়া যাতে অপর কোন রাষ্ট্রের সাহায্য না পায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। রাশিয়ার উপর এই চাপের ফলে চীনের প্রস্তাব অনুযায়ী মাঞ্চুরিয়া থেকে সৈন্য সরিয়ে নিতে সমর্থ হয়। এই মর্মে রাশিয়া ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে "মাঞ্চুরিয়া কনভেনশন" স্বাক্ষরিত করে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু রাশিয়া এই প্রতিশ্রুতি পালন করেনি। ফলে রুশ জাপান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচিত হয়।
তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক এ.জে.পি. টেলর এই চুক্তির প্রেক্ষিতে বলেন, " The Anglo Japanese agreement . . .gave both parties with very wanted " (ইঙ্গ জাপান চুক্তি উভয়পক্ষকে তাই দিয়েছিল যা তারা চেয়েছিল)। ইংল্যান্ড ও জাপান উভয় পক্ষই সুদূরপ্রাচ্যে রুশ অগ্রগতি রোধ করতে চেয়েছিল। কারণ করিয়া ও মাঞ্চুরিয়া রুশ আধিপত্য ইংল্যান্ড ও জাপানের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। ইংল্যান্ড ও জাপানের এই প্রয়াস অনেকাংশে সফল হয়েছিল। কারণ এই চুক্তি সুদূর প্রাচ্যের রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াসকে বন্ধ করেছিল এবং রাশিয়ার অগ্রসন প্রতিহত হয়েছিল। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সমর্থন পেয়ে জাপান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এইভাবে উনবিংশ শতকের শেষ দশকে চীনকে পরাজিত করে জাপানি সম্প্রসারকদের যে সূচনা হয়, রুশ জাপান যুদ্ধে রাশিয়াকে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
চতুর্থত, ইঙ্গ জাপান চুক্তি ব্রিটেনের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রিচার্ড স্টোরি বলেন যে, বিংশ শতকের প্রথম দিকে রাশিয়া শক্তি বিরোধী শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গ্রেট ব্রিটেনের কাছে এই মৈত্রী যথেষ্ট মূল্যবান ছিল। তবে একথা ঠিক যে রাজনৈতিক ও ভাবাবেগ, সবদিক থেকে জাপানের কাছে এই চুক্তি ছিল লাভজনক। এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে জাপান হৃত গৌরবকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ঐতিহাসিক ফেয়ার ব্যাংক ও ভিনাকের মতে ইঙ্গ জাপান মৈত্রী চুক্তি দ্বারা বৃটেনের বিচ্ছিন্ন তার অবসান ঘটেছিল। তবে টেইলর ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে এই মৈত্রীর ফলে বৃটেনের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটেনি। বরং তার বিচ্ছিন্নতা আরো সু প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে দূরপ্রাচ্যে ব্রিটেনের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে ইউরোপের শক্তি সাম্যের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাই ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে এই অবস্থার অবসান ঘটে। এই বছর ইঙ্গ ফরাসি আঁতাত স্বাক্ষরিত হয়। ফলে ইংল্যান্ডে বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে।
পঞ্চমত, জাপানের নেতৃবৃন্দের কাছে মৈত্রী চুক্তি ছিল এক আদর্শ মৈত্রী। কারণ এই চুক্তি দ্বারা উভয় দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত ছিল। রুশ জাপান যুক্তির পর পূর্ব এশিয়ার শান্তি বজায় ছিল। সবশেষে বলা যায়, এই মৈত্রী জাপানকে পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনে সাহায্য করেছিল।
আরো পড়ুন:- দাঁতাত কি? দাঁতাত গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর? CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন