লেনিনের নয়া অর্থনীতি ও পরিকল্পনা
(বিস্তারিত আলোচনা)
গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন নোট
প্রশ্ন, লেনিনের নয়া অর্থনীতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা কর?
লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল সেখানে পূর্ণ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এই উদ্দেশ্য কার্যকারি করতে গিয়ে লেনিন পুরো শাসনতন্ত্রের কাঠামোকে ভেঙে ফেলে। ফলে এক দিকে রাশিয়াকে যেমন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। তেমনি পুঁজিবাদী পশ্চিমের দেশ সমূহের আক্রমণেরও মোকাবিলা করতে হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাশিয়ার প্রবর্তন হয় - যুদ্ধ জনিত সাম্যবাদ বা "war communism"; কমিউনিস্ট শাসনের তিন বছর রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তন অধিকতর বৈপ্লবিক পরিবর্তন ধারণ করে। সাম্যবাদী অর্থনীতি ব্যাখ্যাকে কার্যকারী শাসক শ্রেণী একদিকে যেমন শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, তেমনি জাতীয় জীবনে এইসব জাতীয়করণ নীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয়।
বস্তুত দেশের অর্থনীতিকে যুদ্ধজয়ের লক্ষাভিসারী করা হয়। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সমস্ত কারখানা দ্রুত জাতীয়করণের নীতি গৃহীত হয়। যাতে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে বুর্জোয়াদের অর্থনীতির হ্রাস পায়। ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য নিষিদ্ধ হয়। শিল্প যানবাহনের প্রয়োজনে শ্রমদান বাধ্যতামূলক করা হয়। বস্তিবাসী শ্রমিকদের বসবাসের জন্য বুর্জয়াদের ঘরবাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়। যুদ্ধরত লাল ফৌজ ও খাদ্য সমস্যা সমীকরণের জন্য কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্য অধিগ্রহণ করার নীতি অবলম্বন করা হয়। ব্যাখ্যার মাধ্যমে খাদ্য বন্টন গৃহীত হয়।
রাশিয়ার শ্বেত সন্ত্রাসের বিপদ কেটে গেলে এবং বহিসূত্রের আক্রমণের সম্ভাবনা দূরীভূত হলে শান্তি ফিরে আসে এবং সঙ্গে সঙ্গে এই সত্য উপলব্ধি হয় যে এই পরিবর্তন সমূহ একেবারে বাস্তব জ্ঞান বর্জিত। কারণ বলশেভিকদের জাতীয়করণে কর্মসূচির ফলে সাম্যবাদীদের একটি কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। জমিদারদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে কৃষকরা জমি নিজেদের ভোগ দখলে রাখার দাবি করে এবং ফসলের লাভাংশ সরকারকে দিতে অস্বীকার করে। ফলে সরকার এদের দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করলে কৃষকরা স্বেচ্ছায় উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয় এবং বিদেশ থেকে ত্রাণ এর মাধ্যমে অবস্থা মোকাবিলা করা হয়।
শিল্পক্ষেত্রেও ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। প্রথম দিকে বৃহৎ শিল্প গুলিকে রাষ্ট্র আয়ত্ত করা হলেও পরের দিকে ক্ষুদ্র শিল্প গুলি এর হাত থেকে রেহাই পায়নি। এর ফলে জাতীয় জীবনে স্বতন্ত্র জাতীয় গোলমালের সৃষ্টি হয়। কলকারখানার শ্রমিকদের হাতে এদের মালিকানা অর্পণ করা হয়। শমিকরা অনভিজ্ঞ ও অশিক্ষিত হওয়ায় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। কাঁচামালের অপ্রতুলতা অভাবের ফলে উৎপাদন কমে যায়। ফলে শ্রমিকদের একাংশ কুটির শিল্পে অর্থনিয়োগ করে, ফলে তারা বিদ্রোহ শুরু করে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সু নিয়ন্ত্রিত ভাবে পরিচালিত করার জন্য "Economic Council" গঠন করা হয়। কিন্তু রাশিয়ার তদানীন্তন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পরিসত্তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে "with the Storiet Government" ধ্বনি উঠতে থাকে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে লেনিন উপলব্ধি করেন যে এই ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশুদ্ধ সম্রাজ্যবাদী পরিবেশ রাশিয়ায় তৈরি হয়নি - এটি অনুসন্ধান করতে পেরে লেনিন সাম্রাজ্যবাদ থেকে সরে আসে এবং গণতান্ত্রিক ব্যাখ্যার কিছু নীতি গ্রহণ করে। তিনি গড়ে তোলেন " NEP " - ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে দশম পার্টি কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি এই নীতি পোষণ করেন।
লেনিনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা স্থায়ী হয়েছিল- ১৯২১-২৮ সাল পর্যন্ত। এই পড়বে তিনি কৃষি ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটায় -
১) কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্য গ্রহনের নীতি গৃহীত হয়।
২) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর গ্রহণের নীতি গৃহীত হয়।
৩) ভূমি সম্পত্তির মোকাবিলার ভিত্তিতে অনুপাতিক হারে কর ধার্য করা হয়।
৪) কোন মেটানোর জন্য কৃষক উদ্বৃত্ত শস্য খোলা বাজারে বিক্রি সুযোগ পায়।
৫) কৃষকদের খামারে ক্ষেতের বিকাশ ঘটে। তার জন্য গ্রামাঞ্চলের সমবায় প্রথাকে উৎসাহিত করা হতো। সরকারি ঋণ ও করদান থেকে মুক্তি এই সমবায় থেকে পেত।
• শিল্পের ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করা হয় -
১) যে সমস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানে কুড়িজনের কম সংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত থাকতো সেগুলি মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হতো।
২) শিল্পপতিদের ছোট ছোট ফ্যাক্টরি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হতো।
৩) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ তুলে বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে যায়।
৪) দেশের বিভিন্ন শিল্প সংযোগ সমন্বয়ের প্রথা নিযুক্ত হয়।
৫) জোর করে শিল্প শ্রমিক নিয়োগের নীতি পরিত্যক্ত করা হয়।
৬) শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার নীতি লুপ্ত হয়।
৭) কাজের পরিমাণ ও গুণগত উৎকর্ষের ভিত্তিতে মজুরি দাবির প্রবণতা দেখা যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়, বিদেশি বাণিজ্য ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, বিভিন্ন সমস্যার মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করা হয়। অন্তদেশীয় বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত বাণিজ্যতে মূলধন নিয়োগের অধিকার স্বীকার করা হয়। বিদেশি মূলধনীদের সহজে ইজারা দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শিথিল করার জন্য শর্তের ভিত্তিতে ১০ রকমের কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে লেনদেন প্রতিষ্ঠিত হয়।
একথা বলতে দ্বিধা নেই নতুন অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য ছিল প্রশ্নাতীত। সরকারি কর্মচারীদের সংখ্যা হ্রাস করে রাষ্ট্রে আর্থিক বুনিয়াদ শক্তিশালী করা হয়। আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে সামঞ্জস্যতা রেখে লেনিন নতুন ব্যবসা গড়ে তোলে। শিল্প বিনিয়োগের জন্য বিদেশি ঋণ গ্রহণ করা হয়। ধর্মজোটকে আইন নিষিদ্ধ করা হয়। এক কথায় বলা যায় - এই দুটিকে সাম্যবাদের বাস্তব বৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
পররাষ্ট্র ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অনুভূত হয়। তিনি পুঁজিবাদের দুনিয়ার সমাজতান্ত্রিক বীজ বপন করার চেষ্টা করেন। তাই তিনি পুঁজিবাদের জগতের সঙ্গে আপোষের নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাশিয়াকে তিনি বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে ফেলেন। ১৯২১ সালে এই দুই চুক্তি গৃহীত হওয়ার পর ইংল্যান্ডের সাথে রাশিয়ার বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিছু দেশের মধ্যে জার্মানদের সাথে স্বাক্ষরিত হয় রাফালের চুক্তি। ফলে রাশিয়াতে বিশ্ব রাজনীতির উত্তরণ ঘটতে থাকে। শুধু অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে নয় , এই নীতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও রাশিয়ার মর্যাদা লাভ করে।
পশ্চিমে সমালোকরা একে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদ থেকে বিচ্যুক্তি এবং ধনতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের প্রাথমিক পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। সাম্যবাদীরা অবশ্য এই পশ্চাৎ অপসারণকে অংশ বলে মনে করেন এবং এটাই ছিল ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে একটি ফলশ্রুত সমন্বয়। লেনিন নিজেও একে নিত্যান্তই সামরিক বলে মনে করেছেন। আসলে তিনি এর মধ্যে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে চেয়েছিলেন। বিশ্ব অর্থনীতি বলতে তিনি কখনো ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যা বোঝাতে চাইনি।
এই নীতি গোড়া মার্কসবাদীদের অসন্তুষ্ট করলেও লেনিনের কিছু করার ছিল না। পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের নীতি বিশেষভাবে কাজ করেছিল। এই নীতি সোভিয়েত রাশিয়াকে শক্তিশালী করে তোলে এবং সমাজতন্ত্রবাদ মজবুত করে। রাশিয়ার বিদেশি পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচ্যুত রুশ প্রযুক্তিবাদীরা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং দক্ষতা অর্জন করে। যখন বিদেশীরা অপসারিত হয় তখন রাশিয়ার শিক্ষা উন্নতিতে এই অভিজ্ঞতা ছিল মূল্যবান। ধনতান্ত্রিক সমঝোতা করলেও এই নীতি গণতন্ত্রের প্রবর্তিত ধারা গুলিকে দুর্বল করে তোলেনি। সুতরাং লেলিন প্রবর্তিত নয়া অর্থনীতি এশিয়াকে নতুন করে প্রাণ দান করে।
আরো পড়ুন:- বলশেভিক বিপ্লবে লেনিনের অবদান?CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন