প্রশ্ন:- ব্রিটিশ শাসনকালে তথা উনিশ শতকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আলোচনা কর এবং এর পরিণতি কি হয়?
উত্তর:-
সূচনা:-
ইংরেজ শাসনের সূচনা পর্বে হিন্দু-মুসলিম ভারতবাসী পাঠশালা, টোল ও মাদ্রাসায় আরবি ফারসি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করত।ব্রিটিশ সরকার এই প্রাচ্য শিক্ষাকে প্রথম থেকে সমর্থন করত কারণ কম্পানি মনে করত পাশ্চাত্য শিক্ষা ইংরেজি শিক্ষা পেলে ভারতবর্ষের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে।কিন্তু ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে একটা প্রশ্ন উঠে আসে- যে এত বড় একটি দেশকে গুটিকয়েক ব্রিটিশরা কী চালাতে সক্ষম হবে? প্রশ্নের উত্তরএর সমাধান পাওয়ার জন্য তারা ঠিক করে যে ভারতে কিছু সংখ্যক মানুষকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তারা দেশ শাসন করবে।
দ্বন্দ্বের সূত্রপাত:-
এই পরিস্থিতিতে এদেশে সরকারের প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত সে বিষয়ে একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয় যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত। ঠিক সেই মুহূর্তে 1813 খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেন যে ভারতীয় শিক্ষার জন্য প্রতিবছর এক লক্ষ টাকা দেওয়া হবে সেই অনুসারে জনশিক্ষার নীতিনির্ধারণে উদ্দেশ্যে 1823 খ্রিস্টাব্দে জনশিক্ষা কমিটি বা "কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন" গঠিত হয়।
জনশিক্ষা কমিটিতে বিভেদ:-
জনশিক্ষা কমিটি কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায় তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে ইংরেজি শিক্ষাদানের পক্ষে একটি চিঠি লিখেন। এই চিঠির দৌলতে জনশিক্ষা কমিটি মধ্যেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থনে চূড়ান্ত দেখা দেয় এবং কমিটির সদস্যরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যান।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বাদীর কমিটির মধ্যে যারা প্রাচ্য শিক্ষার সমর্থনে এগিয়ে আসে তারা পরিচিত হোন ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবাদী নামে এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন এইচ. টি প্রিন্সেপ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমুখ। অন্যদিকে যারা পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থনে ছিলেন তাদের পরিচিত হোন আংলিসিস্ট বা পাশ্চাত্য বাদী নামে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন টমাস মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ, স্যান্ডার্স কলভিন প্রমূখ।
মেকলের বক্তব্য:-
বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক এর খ্যাতনামা আইন সচিব টমাস বাবিংটন মেকলে 1835 খ্রিস্টাব্দে একটি প্রস্তাব পেশ করেন যা মেকলে মিনিটস নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবে তিনি বলেন:-
1. প্রাচ্যের শিক্ষা দুর্নীতি গ্রস্থ, অপবিত্র।
2.ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি তাক ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ;
3. প্রাচ্যের শিক্ষা বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন এবং পাশ্চাত্যের তুলনায় সম্পূর্ণ নিকৃষ্ট
4. এদেশের উচ্চ মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটলে "চুইয়ে পড়া নীতি" অনুযায়ী তা ক্রমশ সাধারণ দেশবাসীর মধ্যে সেই শিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে।
5. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ফলে এদেশে এমন একটি সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটবে যারা রক্ত, বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমতী হবে ইংরেজ।
পরিণতি বা মূল্যায়ন:-
শেষ পর্যন্ত মেকলে-এর অসাধারণ বাগ্মীতার ওপর ভর করে এই দ্বন্দ্বে পাশ্চাত্যবাদীরা জয়লাভ করে। 1935 খ্রিস্টাব্দে 7 ই মার্চ থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষা সরকারের শিক্ষা নীতি হিসেবে গৃহীত হয় এবং প্রাচ্য শিক্ষা ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব হারায়। এবং পরবর্তীতে 1944 খ্রিস্টাব্দে লর্ড হার্ডিঞ্জের ঘোষণায় "যে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি জানা আবশ্যক" প্রাচ্যের শিক্ষাব্যবস্থার শেষ পেরেকটি কফিনে পুঁতে দেয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন