Word History
উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস : দ্বিতীয় অধ্যায়
সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদ
প্রশ্ন :
উপনিবেশিকতা বাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বলতে কী বোঝো? আধুনিক বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর:
সূচনা : বিশ্ব ইতিহাসে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ এই সময় পর্ব ভৌগোলিক আবিষ্কার, নবজাগরণ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও উপনিবেশবাদ দ্বারা চিহ্নিত হয়।
উপনিবেশবাদ : ল্যাটিন শব্দ "কলোনিয়া" থেকে কলোনি বা উপনিবেশ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। শব্দটির মূল অর্থ হলো 'মানব সমাজের একটি স্থানান্তরিত অংশ'। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপনিবেশ বলতে বোঝায় যখন কোন একটি দেশ বা জাতি অন্য কোন একটি দেশ বা জাতির ওপর নিজেদের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, তখন নিয়ন্ত্রণকারী দেশটির কাছে নিয়ন্ত্রিত দেশটি উপনিবেশে পরিণত হয় এবং নিয়ন্ত্রণকারী দেশটি হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক দেশ। এই উপনিবেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবতীয় নিয়ম কানুন ও আধিপত্য কে বলা হয় উপনিবেশবাদ বা ঔপনিবেশিকতা।
সাম্রাজ্যবাদ : লাতিন শব্দ Imperium শব্দটি থেকে Imperialism বা সাম্রাজ্যবাদ কথাটি উৎপত্তি হয়েছে। প্রথমদিকে এর অর্থ ছিল সামরিক কর্তৃত্ব। পরবর্তীকালে এর অর্থ দাঁড়ায় বৃহৎ রাষ্ট্রের দ্বারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন এর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যবাদ কথাটি নিন্দাসূচক অর্থে ব্যবহার করা শুরু হয়। সাম্রাজ্যবাদ বলতে সাধারণ ভাষায় বোঝায় ক্ষমতাশীল একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে এক বা একাধিক রাষ্ট্রের একটি বিশেষ সম্পর্ক এবং সম্পর্ক টি হল ক্ষমতাশীল দেশটির দ্বারা অন্য দেশগুলির অর্থনীতিকে ভেঙ্গ দিয়ে নিজেদের স্বার্থে তা ব্যবহার করা ও শোষণ করা।
সাম্রাজ্যবাদের কারণ :
সাম্রাজ্যবাদের পেছনে বেশ কতকগুলি কারণ ছিল সেগুলি হল -
১. ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা:
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে উপনিবেশবাদ নতুনদেশ অধিকার করার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। উপনিবেশের সংখ্যা যেহেতু সীমিত সেহেতু দেশগুলি সরাসরি সংঘর্ষের মাধ্যমে উপনিবেশ গুলির উপর আধিপত্য স্থাপন সচেষ্ট হয়। লেনিন এর মতে "ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ রূপ যার চরম পরিণতি ছিল সংঘর্ষ বা যুদ্ধ।
২. ইউরোপীয় শিল্পপতিদের উস্কানি :
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স,পর্তুগাল জার্মানিতে শিল্পপতি ও পুঁজিপতি শ্রেণীর উদ্ভব হয়। তারা মুনাফা অর্জন ও বিনিয়োগের জন্য নিজ নিজ দেশের সরকারকে উপনিবেশ দখলের জন্য উস্কানি দিতে থাকে। ফলে ইউরোপের দেশ গুলির মধ্যে উপনিবেশ দখলের এক নগ্ন প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
৩. ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের প্রসার:
ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হওয়ায় অল্প সময়ে অধিক পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। উদ্বৃত্ত এই পণ্য সামগ্রী বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপন একান্ত জরুরি হয়ে পড়ে। বিশ্বের বেশিরভাগ উপনিবেশ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দখলে থাকা জার্মানি তার উদ্বৃত্ত উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
৪. আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য স্থাপন:-
ইউরোপের শক্তিশালী দেশ গুলি নিজেদের সামরিক শক্তির জাহির করতে উপনিবেশ স্থাপনে তৎপর হয়। এরা এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে সেখানে নৌ এবং সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে তাদের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার ইন্ধন যোগায়।
৫. খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও প্রসার :
লর্ড ক্রমার, ডেভিড লিভিংস্টোন, স্ট্যানলি প্রমূখ ব্যক্তিদের খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার ও প্রসার ইউরোপীয় দেশ গুলিকে সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্তির সুযোগ এনে দিয়েছিল।
৬. জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ :
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পথপ্রদর্শক ছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। তারা মনে করত যে সাম্রাজ্যবাদের প্রসার জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। জাতির মর্যাদার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয় ইতালি জার্মানি রাশিয়া প্রভৃতি দেশ। জাতির মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তারা উপনিবেশ স্থাপনে সচেষ্ট হলে শুরু হয় পারস্পরিক সংঘর্ষ ও বিরোধীদের।
৭. হবসন এর অভিমত : ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জে এ হবসন তার "ইম্পেরিয়ালিজম : এ স্টাডি"গ্রন্থের সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক কারণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন যে, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় অসম ধন বন্টন এর ফলে পুঁজিবাদী শ্রেণীর হাতে অপরিমেয় মূলধন সঞ্চিত হয়েছিল। এই বাড়তি মূলধন সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটায়।
৮. লেনিনের অভিমত:
রোস্ট কমিউনিস্ট নেতা লেনিনের তার "ইম্পিরিয়ালিজম: দ্যা হায়েস্ট স্টেজ অফ ক্যাপিটালিজম" গ্রন্থি সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেশের শিল্পের চাহিদা পূরণের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদিত পণ্যের বিক্রির বাজার এর সন্ধান কে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
মূল্যায়ন:
পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণ কে চিহ্নিত না করা গেলেও এই বিষয়টি স্পষ্ট যে উদ্বৃত্ত পণ্য সামগ্রী এবং বাজার দখলকে কেন্দ্র করে এই সাম্রাজ্যবাদ প্রসারিত হয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন