উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস (দ্বিতীয় অধ্যায়)
Higher Secondary History (Second chapter)
গুরুত্বপূর্ণ ৮ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন : ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে জাতিগত বৈষম্যের ধারণটি কেমন ছিল? ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে জাতি প্রশ্নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব গুলি কি ছিল?
উত্তর:-
সূচনা : আধুনিক ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাস্ট্র এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের জনগণ সুস্পষ্ট দুটি জাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা - ১. সাম্রাজ্যবাদী শাসক জাতি এবং ২. উপনিবেশগুলোতে বসবাসকারী শাসিত জাতি। সাম্রাজ্যবাদী শাসক যাতে নিজেদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী ছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিশালী জাতিগুলি তাদের অধীনস্থ উপনিবেশের বাসিন্দাদের হীন জাতিভুক্ত বলে বিবেচনা করে তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য মূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। যেমন -
১. জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার : ইউরোপের ঔপনিবেশিক জাতিগুলি উপনিবেশগুলোতে সীমাহীন জাতিগত গৌরবের কথা প্রচার করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল তার "হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ব্রিটিশ শাসনাধীনে অনুন্নত ভারতীয়দের মঙ্গল হচ্ছে। ভারতীয়দের স্বাধীনতা বা স্বশাসন দানের কোনো প্রশ্নই ওঠে না , কেননা, ভারতে ব্রিটিশ শাসন অনন্তকাল টিকে থাকবে। অন্যদিকে লর্ড মেকলে মনে করতেন যে "ইউরোপের ভালো কোন গ্রন্থাগারের একটি তাক সমগ্র ভারত ও আরবের সাহিত্যের সমকক্ষ"
২. অভিভাবকত্বের মানসিকতা: মিশনারি না হয়েও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির কিছু মানুষ এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশ গুলির বাসিন্দাদের স্বঘোষিত অভিভাবক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেন। তারা উপনিবেশের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সংস্কৃতিবান করে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে মিশরে লর্ড ক্রোমার, উত্তমাশা অন্তরীপ লর্ড মিলনার প্রমূখ ব্যক্তি এই স্বঘোষিত অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
৩. যোগ্য জাতি শ্রেষ্ঠত্ব : ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তার যোগ্যতমের উদবর্তন তত্ত্বের বলেছেন, প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে শুধু যোগ্যতম প্রানীরাই বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে । ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলি এই তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ডারউইনের তত্ত্বকে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে ও নিজেদের স্বার্থ পূরণকারী সেই নীতি কে তারা যোগ্যতম জাতির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার তত্ত্ব হিসেবে তুলে ধরে।
৪. শ্রেষ্ঠ জাতির প্রাধান্য:- সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় রাষ্ট্র গুলির নিজ নিজ জায়গা থেকে শ্রেষ্ঠ এবং উপনিবেশে শাসিত জাতি গুলিকে নিকৃষ্ট মনে করত। পাশাপাশি নিকৃষ্ট জাতির উপর শ্রেষ্ঠ জাতি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্মগত অধিকার আছে বলে রাষ্ট্রগুলি মনে করত।
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলি দ্বারা উপনিবেশগুলোতে এই যে জাতিগত ব্যবধান তার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
নেতিবাচক প্রভাব:
১. অমানবিকতা: ইউরোপের ঔপনিবেশিক শ্বেতাঙ্গ শাসন জাতির দ্বারা এশিয়া ও আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত জাতি দীর্ঘকাল ধরে ঘৃণা, বিদ্বেষ, অবহেলা ও অমানবিকতার শিকার হয়। শাসিত কৃষ্ণাঙ্গরা নিজেদের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ঔপনিবেশিক ভারতের কোন কোন ইউরোপীয় ক্লাব এ নোটিশ ঝুলয়ে দেয়া হতো যে, "কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।"
২. জাতিগত শোষণ:- ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে শাসক ও শোষিতের মধ্যেকার জাতিগত ব্যবধান উপনিবেশের অনগ্রসর মানুষের ওপর তীব্র শোষণ ও অত্যাচারের সূত্রপাত ঘটায়। উপনিবেশের পরাধীন জাতিগুলির ওপর বিপুল পরিমাণ করের বোঝা চাপানো হয়। শাসিত জাতিগুলি নিজেদের খাদ্য উৎপাদন বন্ধ রেখে ইউরোপের ঔপনিবেশিক প্রভুদের শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করতে বাধ্য হয়। দেশীয় কৃষি ব্যবস্থা ও কুটির শিল্প ধ্বংস হয়। ফলে তীব্র আর্থিক শোষণ, খাদ্যাভাব, বেকারত্ব প্রভৃতি বিষয় পরাধীন জাতি গুলিকে সীমাহীন দুরবস্থায় ফেলে দেয়।
৩. দেশীয় ঐতিহ্য আঘাত:- নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গর্বিত শ্বেতাঙ্গ জাতি এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশ গুলি তে বিভিন্ন জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য তে জোর আঘাত হানে। তাদের আঘাতে প্রাচ্যের প্রাচীন বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লুপ্ত হতে শুরু করে।
৪ . শ্রমিক রপ্তানি : পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ জাতিগুলি প্রথমদিকে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশে রপ্তানি করে সেখানকার উৎপাদনমূলক কাজগুলি সচল রাখত। এইভাবে উপনিবেশের মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এক শ্রমিক শ্রেণী তৈরি হয় যারা ছিল সম্পূর্ণ অর্থে একপ্রকার দাস।
ইতিবাচক দিক :
১. জ্ঞানের প্রসার : ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক জাতিগুলি উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে উপনিবেশ গুলির উপর জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে পেরেছিল। মিল, বার্ক, মেকলে, মিল্টন, রুশো, ভলতেয়ার প্রমূখ পাশ্চাত্য দার্শনিক এর মতবাদ এর সঙ্গে প্রাচ্যের মানুষ পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।
২. পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সান্নিধ্য: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রসারের ফলে প্রাচ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়। উপনিবেশগুলোতে পাশ্চাত্যের ভাষা প্রসারিত হলে এই ভাষার মাধ্যমে উপনিবেশের বাসিন্দারা বহির্জগতের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পায়।
৩. শিল্পকলার অগ্রগতি: পাশ্চাত্যের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পীরা উপনিবেশের নতুন জাতিগুলির সংস্পর্শে এসে তাদের শিল্প সৃষ্টিতে নতুনত্ব আনেন। ফরাসি শিল্পী পল গগা, স্পেনের চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো প্রমুখরা পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্পের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি প্রাচ্যের সঙ্গীত চর্চা প্রসারিত হয়।
৪. বিজ্ঞানের উন্নতি: আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে উপনিবেশগুলোতে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটে এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সমাজ সংস্কার আন্দোলন জোরদার হয়।
৫. নবজাগরণ : ইউরোপের সভ্য জাতি গুলি এশিয়া ও আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে আধুনিক গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রচারের ফলে উপনিবেশ গুলিতে এক ধরনের নবজাগরণের সূচনা হয় বলে লেনার্ড উলফ মনে করেন।
মূল্যায়ন: এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন উপনিবেশ গুলির কাছে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ ছিল একটি অভিশাপ। এর কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এর নেতিবাচক দিক ছিল সবথেকে বেশি। সেই কারণেই পরবর্তী সময়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ উপনিবেশ একে একে স্বাধীন হতে শুরু করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন