Click Below

Breaking

Know more

Search

মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক || মাধ্যমিক ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

 মাধ্যমিক ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

Madhyamik History Suggestion



প্রশ্ন : ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো?

অথবা,

ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলায় শিক্ষাবিস্তার প্রসারে ছাপাখানার কি ভূমিকা ছিল?

অথবা,

ছাপাখানায় মুদ্রণের বইপত্রের মাধ্যমে বাংলায় কিভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটে?

উত্তর:

ভূমিকা: ভারতে ছাপাখানা বিস্তার শিক্ষাক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসে যার প্রভাব বাংলাতেও এসে পড়ে। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বাংলায় আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে ছাপাখানার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এইসব ছাপাখানায় শিক্ষার্থীদের উপযোগী বহু বইপত্র ছাপা হয়ে তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায়। ফলে বাংলায় শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার করতে শুরু করে।


প্রেক্ষাপট: বঙ্গদেশে আধুনিক ছাপাখানার প্রতিষ্ঠার আগে হাতে লেখা বইপত্রের দ্বারা শিক্ষাগ্রহণের কাজ চলত। এই বইয়ের মূল্য খুব বেশি হতো বলে এই সময় নিম্নবিত্ত দরিদ্র সমাজে শিক্ষার প্রসারের বিশেষ সুযোগ ছিল না। তাই এই সময় বাংলা শিক্ষাদান মূলত সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তাছাড়া এই সময় শিক্ষা বলতে ছিল মূলত দীর্ঘ আরবি বা সংষ্কৃত কবিতা বা শাস্ত্রের বক্তব্য মুখস্ত করা। এককথায় ছাপা বই পত্র বাজারে আসার আগে বাংলা শিক্ষার প্রসার ছিল খুবই সীমাবদ্ধ।


ছাপা বইয়ের বাজার: উনবিংশ শতকের শুরু থেকে ছাপাখানায় ছাপা প্রচুর সংখ্যক সুদৃশ্য বইপত্র বাজারে আসতে শুরু করে। একদিকে এইসব মুদ্রিত বইয়ের যোগান ছিল বিপুল। অন্যদিকে এগুলি দামেও ছিল সস্তা। ফলে দরিদ্র, সাধারণ শিক্ষার্থী ও পাঠকদের হাতে সহজেই ছাপাখানায় ছাপা বই পত্র পৌঁছে যায়। বাংলায় ছাপাখানা গুলি থেকে মাতৃভাষা বাংলায় ছাপা প্রচুর বইপত্র বাজারে আসতে শুরু করলো। শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষা বাংলায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় ,ফলে বাংলা শিক্ষা বিস্তার ব্যাপক প্রসার ঘটলো।


পাঠ্যপুস্তকের সরবরাহ: বাংলার ছাপাখানা গুলিতে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রচুর পরিমাণে পাঠ্যপুস্তক ছাপা হতে থাকে। এইসব পাঠ্যপুস্তক এর প্রধান বিষয়বস্তু ছিল সাহিত্য ,ব্যাকরণ ,ইতিহাস, ভূগোল,গণিত, বিজ্ঞান। ছাপাখানায় মুদ্রিত বইপত্রের সুন্দর মুদ্রণ ও কম দাম হওয়ায় তা গ্রাম বাংলার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়। এইসব বইগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। 


নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান :ছাপাখানা গুলিতে মুদ্রিত বইপত্র বিনামূল্যে বা সস্তায় ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি (১৮১৭-খ্রি:)প্রতিষ্ঠিত হয়।১৮১৮ খ্রি:- কলকাতা স্কুল সোসাইটি স্থাপিত হলে তার অধীনে বেশ কয়েকটি স্কুল গড়ে ওঠে। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষা পসারের উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তক এর হাজার হাজার কপি শ্রীরামপুরের ছাপাখানায় ছাপায়। ফলে শহর ও গ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে সমস্ত সাধারণ মানুষ বিদ্যাশিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল তাদের হাতে ছাপাখানায় মুদ্রিত সুন্দর ঝকঝকে বই পৌঁছে যায়।



শ্রীরামপুর ছাপাখানা: খ্রিস্টান মিশনারী উইলিয়াম কেরি ১৮০০- খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করলে এদেশে শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক সুবিধা হয়। এশিয়ার তৎকালীন সর্ববৃহৎ এই ছাপাখানা থেকে বাংলা সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় বাইবেল,রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য প্রভৃতি অনুবাদ, হিতোপদেশ, গবেষণা মূলক প্রবন্ধ, রামরাম বসুর' প্রতাপাদিত্য চরিত্র 'প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল সংখ্যক পাঠ্যপুস্তক এই ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়।



শিশুশিক্ষার বই: বাংলার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে ছাপাখানা গুলেতে প্রচুর সংখ্যক শিশুশিক্ষা বিষয়ক বইপত্র ছাপা হতে থাকে। এসব মুদ্রিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- মদনমোহন তর্কালংকারের 'শিশুশিক্ষা' , ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়', রামসুন্দর বসাক এর 'বাল্যশিক্ষা' প্রভৃতি। বিদ্যাসাগর রচিত 'বর্ণপরিচয়'- এর তাঁর জীবাদ্দশাতেইমোট ১৫২-টি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং বইটির ৩৫-লক্ষেরও বেশি কপি পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়।১৮৬৯-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৪১ লক্ষেরও বেশি শিশুশিক্ষার বই ছাপা হয়।


অন্যান্য পাঠ্যবই : বিদ্যালয় স্তরের বিভিন্ন বিষয়ের প্রচুর পাঠ্যবই ছাপাখানা গুলিতে মুদ্রিত হয়ে সস্তায় বাংলার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে যায়। এরূপ কিছু উল্লেখযোগ্য পাঠ্যবই ছিল- গোবিন্দপ্রসাদ দাস রচিত 'ব্যাকরণ সার‍', প্রাণলাল চক্রবর্তী রচিত 'অঙ্কবোধ', কেদারেশ্বর চক্রবর্তী রচিত 'বাঙ্গালার ইতিহাস', আনন্দকিশোর সেন রচিত 'অর্থের সার্থকতা', দীননাথ সেন রচিত 'বাংলাদেশ ও আসামের সংক্ষিপ্ত বিবরণ' এবং 'ঢাকা জেলার ভূগোল এবং সংক্ষেপে ঐতিহাসিক বিবরণ', প্রভৃতি।এইসব বইপত্র বাংলার গ্রামগঞ্জে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের পর থেকে বাংলায় বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য প্রভৃতির অনুবাদ, বিভিন্ন গবেষণাপত্র প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। এগুলি সুলভে বাংলার সাধারণ পাঠকদের হাতে পৌঁছে যায়।


সংবাদপত্রাদি : ঊনবিংশ শতকে বাংলার ছাপাখানাগুলি থেকে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে বাংলার গণশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এসব সংবাদপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মার্শম্যান সম্পাদিত মাসিক 'দিগদর্শন' ও সাপ্তাহিক 'সমাচার দর্পণ', গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'বেঙ্গল গেজেট', রামমোহন রায় সম্পাদিত 'সম্বাদ কৌমুদী', ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত 'সমাচারপত্রিকা', ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত 'সম্বাদ প্রভাকর', দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত 'তত্ত্ববোধিনী' প্রভৃতি। ছাপাখানাগুলি থেকে বাংলা ও ইংরেজিতে বেশকিছু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রও প্রকাশিত হতে থাকে। এইসব সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রগুলিতে দৈনন্দিন সংবাদ ছাড়াও নিয়মিত বিভিন্ন ঞ্জানমূলক বিষয়ের আলোচনা স্থান করে নেয়।

মূল্যায়ন : পরিশেষে বলা যায়  ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জীবিকার সন্ধান উন্মোচন করে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here