Click Below

Breaking

Know more

Search

বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ

 উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

ঔপনিবেশিক ভারতের শাসন

উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস ৮ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর


প্রশ্ন :- ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা,

মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার এর পটভূমি ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

অথবা,

মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন শর্ত এবং ত্রুটি আলোচনা করো।

অথবা,

মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন সংস্কারের পটভূমি, শর্ত, সমালোচনা, গুরুত্ব লেখ



উত্তর

সূচনা : ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন সংস্কারের ইতিহাসে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের মরলে মিন্টো সংস্কার আইন ভারতীয়দের খুশি করতে পারেনি। এবং এই পাশাপাশি পরবর্তী প্রায় এক দশকের ভারতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে নতুন আইন প্রণয়ন করে তা মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার নামে পরিচিত।


পটভূমি :- মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন প্রবর্তনের নেপথ্যে অনেক কারণ ছিল। সেই কারণ গুলি হল:-

(১) সন্ত্রাসবাদি কার্যকলাপ→ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের ভিতর ও বাইরে ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে বিপ্লবীরা লিপ্ত ছিলেন। এমনকি তারা সমগ্র ভারতে এক অখণ্ড ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসীবাদী কার্যকলাপে উদ্যোগ গ্রহণ করে।


(২) যুদ্ধের জন্য অর্থের প্রয়োজন→ ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয়দের অর্থ ও লোকবল উভয়ের প্রয়োজন ছিল এবং এই পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের শাসনতান্ত্রিক অধিকার দাবি প্রত্যাহার করা তাদের কাছে বাঞ্ছনীয় ছিল না।


(৩) লখনৌ অধিবেশন→ ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের লখনৌ অধিবেশনের সময় চরমপন্থীরা পুনরায় জাতীয় কংগ্রেসের যোগ দেয়। এর ফলে জাতীয় কংগ্রেস পুণরায় শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ হয় এবং জাতীয় কংগ্রেসের স্বরাজ বা পূর্ণস্বাধীনতার দাবি মুসলিম লীগ মেনে নেয়। ফলে মুসলিম লীগ ও জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।


(৪) হোমরুল আন্দোলন→ ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে লখনৌ চুক্তির প্রভাবে বালগঙ্গাধর তিলক ও শ্রীমতি অ্যানি বেসান্তের এর নেতৃত্বে হোমরুল আন্দোলন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ করতে থাকে।


(৫)  স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা→ হোমরুল আন্দোলনের প্রভাবে ব্রিটিশ সরকার উদদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ফলে ভারত সচিব মন্টেগু ঘোষনা করে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর  ভারতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা।

মন্টেগু চেমসফোর্ড আইনের শর্তাবলি

[1] ক্ষমতা বণ্টন: মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের দ্বারা কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ও আয় সুনির্দিষ্টভাবে বণ্টিত হয়।


কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে দেশরক্ষা, রেলব্যবস্থা, মুদ্রাব্যবস্থা, বৈদেশিক সম্পর্ক, আয়কর, শুল্ক, বাণিজ্য, ডাকব্যবস্থা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা: প্রাদেশিক সরকারগুলির হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সেচ, ভূমিরাজস্ব, যােগাযােগব্যবস্থা প্রভৃতি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির দায়িত্ব দেওয়া হয়।


[2] কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহক পরিষদ: মন্টেগু চেমসফোর্ড আইনের দ্বারা ৮ জন সদস্য নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহক পরিষদ বা বড়ােলাটের শাসন পরিষদ (Executive Council) গঠিত হয়। এই ৮ জনের মধ্যে অন্তত ৩ জন সদস্য হবেন ভারতীয়। এই শাসন পরিষদের সহায়তায় বড়ােলাট শাসন পরিচালনার দায়িত্ব পান। বড়ােলাট তার কার্যাবলির জন্য ভারতীয় আইনসভার কাছে নয়, ভারত-সচিব ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে দায়ী থাকতেন।


[3] কেন্দ্রীয় আইনসভা: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের দ্বারা কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠন করা হয়। এর বিশেষ দিকগুলি ছিল—


দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের দ্বারা কেন্দ্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয়। এর নিম্নকক্ষের নাম হয় কেন্দ্রীয় আইনসভা (Legislative Assembly) এবং উচ্চকক্ষের নাম হয় 'রাষ্ট্রীয় পরিষদ' (Council of States)।



সদস্যসংখ্যা: উচ্চকক্ষের ৬০ জন সদস্যের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বড়লাটের দ্বারা মনােনীত ও ৩৪ জনকে নির্বাচিত এবং নিম্নকক্ষের ১৪০ (পরে ১৪৫) জন সদস্যের মধ্যে ৪০ জনকে মনােনীত এবং ১০০ (পরে ১০৫) জনকে নির্বাচিত করার ব্যবস্থা করা হয়। উভয় কক্ষে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।


[4] প্রাদেশিক দ্বৈতশাসন: মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের দ্বারা প্রদেশগুলিতে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয়। এর ৭০ শতাংশ সদস্য নির্বাচিত ও ৩০ শতাংশ সদস্য গভর্নরের দ্বারা মনােনীত করার ব্যবস্থা হয়। প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বগুলিকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা—


সংরক্ষিত বিষয়

এবং হস্তান্তরিত বিষয়। 


[5] ভারত সচিবের কাউন্সিল: মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনে বলা হয় যে, ভারত সচিবের কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ৮ থেকে ১২ জন হবে। এর অর্ধেক সদস্য নিযুক্ত হবেন ভারতে কমপক্ষে ১০ বছর বসবাস বা চাকরি করেছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে। এই সদস্যদের বেতন ও ভাতা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ সরকারের হাতে।

আইনের ত্রুটি বা সমালোচনা

মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইন নানা দিক থেকে যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ ছিল । এই সংস্কার আইন এর ত্রুটি বিচ্যুতি নিম্নে আলোচনা করা হল।


(১) প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থার অভাব→ এই সংস্কার আইনে বড়লাট ও কার্যনির্বাহী সভার হাতে সব ক্ষমতা বণ্টিত থাকে এবং বড়লাট আইনসভার যে কোনো প্রস্তাব নাকোচ করে দিতে পারতেন। এই আইনে ভারতে কোন প্রতিনিধিত্ব মূলক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়নি।


(২) দায়িত্বশীলতার অভাব→ এই আইনের ফলে ভারতের বড়লাট তার কাজের জন্য কারোর কাছে দায়ী ছিলেন না। এর ফলে দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে।


৩) ভোটাধিকার→ এই আইনে ভারতের খুব কম সংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার পায়।


(৪) সাম্প্রদায়িকতা→ এই আইনের ফলে ভারতে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ আরো বৃদ্ধি পায়। শিখ,খ্রিস্টান, মুসলিম ও বর্ণহিন্দুদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

(৫) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি:- ভারতীয় আইনসভার ক্ষমতা হ্রাস করে ভারত শাসন বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়।


মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের গুরুত্ব



[1] বেসরকারি সদস্য বৃদ্ধি: মর্লে-মিন্টো আইনের দ্বারাই ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে প্রথম বেসরকারি সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। এর দ্বারা ভারতে প্রগতিশীল শ্রেণি সরকারের আইন রচনার কাজে অংশগ্রহণের সুযােগ পায়।


[2] শাসনবিভাগে অংশগ্রহণ: মর্লে-মিন্টো আইনের দ্বারা বড়ােলাটের শাসন পরিষদে একজন ভারতীয় সদস্য গ্রহণ করা হয়। এর ফলে সরকারি প্রশাসনে ভারতীয়দের যুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।


[3] স্বায়ত্তশাসনের সােপান: ভারতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে মর্লে-মিন্টো আইন। ব্রিটেনের সাংসদ হেনরি কটন এই আইনকে ভারতে স্বায়ত্ত্বশাসন প্রবর্তনের লক্ষ্যে একটি ধীর পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন।


[4] আইনের শাসন: ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তনের আগে ভারতে মােগল যুগ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রচলিত ছিল, তার পরিবর্তে মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন ভারতে সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রচলন ও আইনের শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।


উপসংহার

  মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইন ত্রুটি বিচ্যুতি ও যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে তৈরি হয়েছিল। জাতীয় কংগ্রেস এই আইন কে 'তুচ্ছ, নৈরাস‍্য কর ও অসন্তোষ' জনক বলে অভিহিত করেছেন। অপরদিকে নরমপন্থী গণ বলেছেন 'সঠিক ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করেছেন।








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here