একাদশ শ্রেণীর ইতিহাস
দ্বিতীয় অধ্যায় : আদিম মানব থেকে প্রাচীন সভ্যতা সমূহ
৮ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন,
প্রাচীনকালে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে ওঠার কারণ ? এই নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার বৈশিষ্ট্য গুলি লেখ ?
অথবা
কী কী সুবিধার কারণে প্রাচীনকালে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল ? এর বৈশিষ্ট্য গুলি লেখ?
উত্তর,
সূচনা - প্রাচীনকালে যে ক'টি সভ্যতার কথা জানা যায় তার বেশিরভাগই নদীকেন্দ্রিক বা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য সভ্যতা গুলি হল সুমেরীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা ও পিকিং সভ্যতা প্রভৃতি। এই প্রত্যেকটিই নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।
আদিম মানুষ কেন নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে এই সভ্যতাগুলি গড়ে তুলতেন এর পেছনে বেশ কিছু সুবিধা জনক কারণ রয়েছে। সেই কারণ গুলি হল নিম্নরূপ-
১) পানীয় জলের সুবিধা - এই পানীয় জলের যোগান মূলত ছিল প্রধান কারণ নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গুলি গড়ে ওঠার পেছনে। প্রাচীনকালে মানুষ পানীয় জল হিসেবে মূলত নদীর জল পান করতো। এই কারণে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে সভ্যতার বিকাশ ঘটায় কার কারনে মানুষ পানীয় জলের সুবিধা পেত, তাদের পানীয় জল সংক্রান্ত কোনো অসুবিধা হতো না।
২) কৃষি কাজের সুবিধা- নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলি প্রতি বছর বন্যায় পলিমাটিতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, যা কৃষিকাজের পক্ষে খুবই উপযােগী। এ ছাড়া অঞ্চলগুলিতে খাল কেটে নদী থেকে জল এনে সারাবছর জলসেচ করা যেত। এভাবে চাষবাস উন্নত হওয়ায় এবং নানাবিধ ফসল উৎপাদনের সুবিধা থাকায় নদীর তীরে মানুষ সভ্যতা গড়ে তােলে।
৩) পশু পালনের সুবিধা- নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর বন্যা হওয়ার ফলে পলি সঞ্চিত হয় এবং সেখানে আপনা থেকেই প্রচুর ঘাস জন্মায় যা তৃণভোজী পশুদের প্রধান খাদ্য। তাই সহজেই পশুপালন সম্ভব হয় এবং পশু খাদ্যের যোগান ভরপুর পরিমাণে মেলে। যে কারনে নদী কেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
৪) বসবাসের সুবিধা- নদী তীরবর্তী অঞ্চল গুলোতে সমতল ভূভাগ থাকার কারণে ও কৃষিকাজ,পশুপালন ও পানীয় জলের যোগান খুব সহজে পাওয়ায় মানুষের নদী তীরবর্তী অঞ্চল গুলি বসবাসের পক্ষে উপযোগী একটি জায়গায় পরিণত হয়। যার কারণে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গুলি গড়ে ওঠে।
৫) যোগাযোগ ও যাতায়াতের সুবিধা - প্রাচীন কালে মানুষ নদীপথের মাধ্যমেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করত। নদীপথে যেহেতু সহজে ও খুব তাড়াতাড়ি যাতায়াত করা যায় তাই অনেকেই নদীর ধারে বসবাস করতে শুরু করল।
৬) ব্যবসা বাণিজ্য সুবিধা - প্রাচীনকালে নদী তীরবর্তী অঞ্চল গুলিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত খুবই সহজ ছিল। নৌকা ছিল সে সময় এর প্রধান পরিবহন মাধ্যম। যার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমটা ধীরে ধীরে শুরু হয় নদী পথের মাধ্যমে। ফলে নদী তীরবর্তী অঞ্চল গুলোতে ধীরে ধীরে বিপুল পরিমাণে নদী কেন্দ্রিক সভ্যতা গুলি গড়ে উঠতে শুরু করে।
নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার বৈশিষ্ট্য :-
এই নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার একাধিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
(ক) কৃষিকাজের প্রসার :-নদী তীরবর্তী বন্যায় পলিমাটি দ্বারা প্লাবিত অঞ্চলগুলিতে কৃষিকাজ খুবই ভালো হয়।নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। নদীতীরবর্তী অঞ্চলে খাল কেটে অনুবর জমিতে জলসেচের সাহায্যে তারা ফসল ফলাতে শুরু করে।
(খ) শিল্পের প্রসার :-খাদ্যের জোগান নিশ্চিত থাকায় নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার অনেকেই শিল্পকর্মের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। এ যুগের শিল্পের মধ্যে অন্যতম ছিল—ধাতুশিল্প, বয়নশিল্প, মৃৎশিল্প, অলংকার নির্মাণ শিল্প, গৃহনির্মাণ শিল্প ইত্যাদি।
(গ) বাণিজ্যের প্রসার :-নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাণিজ্য। প্রধানত নদীপথে বাণিজ্য চলত। স্থলপথেও কিছু কিছু বাণিজ্য হত। বিনিময়প্রথার মাধ্যমেই মূলত বাণিজ্যিক লেনদেন চলত। নদীকেন্দ্রিক সভ্যতাগুলির সমাজে বণিক শ্রেণির প্রাধান্য ছিল।
(ঘ) লিপির ব্যবহার :-নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার অপর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল লিপির ব্যবহার। সুমেরের কিউনিফর্ম লিপি, মিশরের হায়ারােগ্লিফিক লিপি থেকে নদীমাতৃক সভ্যতাগুলির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারা যায়।
(ঙ) পশু শক্তির যথাযথ ব্যবহার :- এসময় মানুষ পশুকে কৃষিকাজ ও পরিবহণের কাজে আরও ভালােভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। নদীকেন্দ্রিক সভ্যতায় গৃহপালিত পশুর মধ্যে অন্যতম ছিল কুকুর, ছাগল, গােরু, ভেড়া, শূকর প্রভৃতি।
পরিশেষে বলা যায় একাধিক সুবিধার জন্য প্রাচীনকালের মানুষ নদীর তীরে বসবাস করত। মানুষের এই দলবদ্ধ হয়ে নদীতীরে বসবাস করার ফলে এই নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গুলি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে এটি নগর পরিকল্পনা বা নগরায়নের সূচনা করে। এই নদী কেন্দ্রিক সভ্যতা গুলির বিকাশের বৈশিষ্ট্য বর্তমানে নগরায়ন গুলি থেকেই লক্ষ্য করা যায়। সেটি বুঝতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন