প্রশ্ন,
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কি ছিল? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রেক্ষাপট, শর্তাবলী ও প্রভাব আলোচনা করো।
সূচনা - চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হলো এক ধরনের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতে আসার পর ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এই ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তার শাসনকালে এটিছেলে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে একাধিক লাভজনক উদ্দেশ্য ছিল।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উদ্দেশ্য-
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো প্রবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য গুলি হল-
(১) সমর্থক গোষ্ঠীর উদ্ভব- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারতে ইংরেজদের একটি নতুন অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হবে যা তাদের সমর্থক হিসেবে কাজ করবে।
(২) সুনিশ্চিত আয়ের যোগান- কোম্পানি আশা করেছিল যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করলে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব পাবে। ফলে তাদের আয়ের অনিশ্চিয়তা দূর হবে।
(৩) বাজেট তৈরির সুবিধা- রাজস্ব থেকে প্রতি বছর সুনিশ্চিত আয় হলে সরকারের পক্ষে বার্ষিক আয়ব্যয়ের বাজেট তৈরির কাজ সহজ হবে।
(৪) কোম্পানির পরোক্ষ উদ্দেশ্য-
জমিতে স্থায়ী অধিকার পেয়ে জমিদাররা কৃষি ও কৃষকের উন্নতির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করবেন। এতে দেশের সমৃদ্ধি বাড়বে এবং পরােক্ষে কোম্পানিরই লাভ হবে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট-
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গেলে যে বিষয়গুলি লক্ষণীয় সেগুলি হল নিম্নরূপ-
(১) ওয়ারেন হেস্টিংসের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ত্রুটি:-
ওয়ারেন হেস্টিংসের পাঁচসালা বন্দোবস্ত (১৭৭২ খ্রি.) এবং একসালা বন্দোবস্ত (১৭৭৭ খ্রি.) যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এই সকল ব্যবস্থার ফলে সরকারের বার্ষিক আয় অনিশ্চিত হয়ে পরে। এই সকল ত্রুটি দূর করার জন্য ও স্থায়ীভাবে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার পরিচালনার জন্যে কর্নওয়ালিশকে ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে পাঠানো হয়।
(২) দশসালা বন্দোবস্ত- কর্নওয়ালিশ- 'জন শােরের' কিছু বক্তব্যে আকৃষ্ট হন। বন্দোবস্ত সম্পর্কে দীর্ঘ আলােচনার পর তিনি ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলা ও বিহারের এবং ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার জমিদারদের সঙ্গে দশ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্তের কথা ঘােষণা করেন। এই ব্যবস্থা দশসালা বন্দোবস্ত নামে পরিচিত।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্তাবলী-
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একাধিক বৈশিষ্ট্যরূপ শর্তাবলি লক্ষণীয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বলা হয়-
১) জমিদার-তালুকদারেরা বংশানুক্রমিকভাবে জমির ভোগ দখল করতে পারবে।
২) জমিদারেরা ইচ্ছামত জমি দান, জমি বিক্রি বা বন্দক রাখতে পারবেন।
৩) নির্ধারিত ভূমির রাজস্বের শতকরা 90 ভাগ সরকার এবং বাকি 10 ভাগ জমিদার পাবেন।
৪) সূর্যাস্ত আইন অনুসারে জমিদারেরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, নির্দিষ্ট দিনে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে।
৫) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধ করতে না পারলে, তাকে সমগ্র জমিদারি বা তার অংশ বিক্রি করে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব মেটাতে হবে। অন্যথায় জমিদারি বাজেয়াপ্ত হবে।
৬)ভবিষ্যতে খরা, বন্যা, মহামারি বা অন্য কোনাে প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও রাজস্ব মকুব করা হবে না।
৭) ভূমিরাজস্বের পরিমাণ ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের হারেই বহাল থাকবে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব -
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো বাংলা তথা ভারতের আর্থসামাজিক দিকটির উপর বিশেষত কৃষক শ্রেণীর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। বাংলার ইতিহাসে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই ব্যবস্থা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ভূমি ও সমাজ উভয়ক্ষেত্রেই এক বিরাট পরিবর্তন আনে। জে. সি. মার্শম্যান চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ব্রিটিশ সরকারের এক দৃঢ়, সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতের সমাজ ও অর্থনীতিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গভীর প্রভাব পড়েছিল।
আরো পড়ুনঃ-ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালে বিভিন্ন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো। Click here
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন