অবশিল্পায়ন:-
অবশিল্পায়নের আক্ষরিক অর্থ হল- শিল্পের অবনমন বা শিল্পের অধোগতি। অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় মূলত শিল্পায়নের বিপরীতমুখী ধারা অর্থাৎ অর্থনীতিতে যদি শিল্পের গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং একইসঙ্গে কৃষির গুরুত্ব বাড়তে থাকে তবেই তা অবশিল্পায়ন হিসেবে ধরা হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে একদিকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব, কোম্পানির অসম শুল্ক নীতি ও অত্যাচার এবং অন্যদিকে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির অবক্ষয়ের ফলে বাংলার তাঁত-বস্ত্রশিল্পসহ অন্য শিল্পের কারিগররা ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, একেই- অবশিল্পায়ন বলা হয়।
অবশিল্পায়নের ফলাফল :-
অবশিল্পায়নের সুফল কিছুই ছিল না বরং ভারতীয় অর্থনীতিতে অবশিল্পায়নের একাধিক কুফল লক্ষ্য করা যায়।এই ফলাফল গুলি হল নিম্নরূপ-
১) ভারতীয় শিল্প বিপর্যয়:- এই অবশিল্পায়নের ফলে ভারতীয় তাঁত, বস্ত্র শিল্প, কুটির শিল্প সহ একাধিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারতে সনাতনী কারিগরি শিল্প মূলত বস্ত্রশিল্প গভীর বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল।
২) বেকারত্ব বৃদ্ধি:- অবশিল্পায়নের ফলে প্রচুর সংখ্যক কারিগর কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। শুধু বাংলাতেই ১০ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছিল। দেশে কর্মহীনতা ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়।
৩) কৃষিকাজের গুরুত্ব বৃদ্ধি :-অবশিল্পায়নের ফলে বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলি বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ করা শুরু করেন। ফলে শিল্পের গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং একইসঙ্গে কৃষির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। যার কারণে কৃষিজমি ও শ্রমিকের ওপর চাপ বেড়ে গিয়েছিল।
৪) রপ্তানিকারক দেশথেকে আমদানিকারক:-
অবশিল্পায়নের ফলে ভারত থেকে যে সমস্ত শিল্পজাত দ্রব্য-পণ্য রপ্তানি করা হতো সেসব ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। ভারত ক্রমশ রপ্তানিকারক দেশ থেকে আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়।
৫) কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশ:- অবশিল্পায়নের ফলে ভারতবর্ষ একটি কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। এখানকার কাঁচামাল সস্তায় ক্রয় করে ইংরেজ বণিকরা ইংল্যান্ডে রপ্তানি করতে থাকে। ভারতের কাঁচা তুললা, কাঁচা রেশম, নীল, চা প্রভৃতি কাঁচামাল নিয়মিত বিলাতের কারখানাগুলিতে চলে যেতে থাকে। এর ফলে ইংল্যান্ডের শিল্পায়নে গতি আসে।
৬) বিলাতি পণ্য আমদানি:- দেশীয় শিল্পের ধ্বংসের ফলে ভারত একটি রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়। বিলাতের ম্যাঞ্চেস্টার, ল্যাঙ্কাশায়ার অন্যান্য স্থানের শিল্পজাত পণ্য ভারতে আমদানি শুরু হয়। কেবল সুতিবস্ত্র নয়, রেশম ও পশমজাত দ্রব্য, লােহা, মৃৎশিল্প, কাচ, অস্ত্রশস্ত্র, ঢাল-তলােয়ার, খােদাই ও কারুকার্যের সঙ্গে জড়িত শিল্প প্রভৃতির যথেচ্ছ আমদানির ফলে দেশীয় শিল্পগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
৭) অর্থনৈতিক বিপর্যয়:- এই অবশিল্পায়ন অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।
৮) দারিদ্রতা ও দুর্ভিক্ষ:- অবশিল্পায়নের ফলে ভারত একটি ধনী ও প্রথম শ্রেণীর অর্থনীতির দেশ থেকে "দরিদ্র" দেশে রূপান্তরিত হয়। দারিদ্রতা, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী ভারতীয় জনজীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।
৯) নগরজীবনের অবক্ষয়:- অব-শিল্পায়নের ফলে ভারতের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শহর গুলির অবক্ষয় শুরু হয়। অষ্টাদশ শতকে মুরশিদাবাদ, সুরাট, মসুলিপট্টম, ঢাকা, তাঞ্জর প্রভৃতি নগর ক্রমে জনবিরল হতে থাকে এবং নগরের অবক্ষয় শুরু হয়।
• এছাড়াও অবশিল্পায়নের আরো বেশ কিছু ফলাফল দেখা যায়- অনেক কর্মহীন যুবক বিদ্রোহী দলে যোগ দিতে থাকে এবং এই অবশিল্পায়ন ছিল এমন এক প্রকার শিল্পের অবনমন বা শিল্প বিপর্যয় ঘটায়। যার ফলে বহু সংখ্যক তাঁতি ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা দেশ ছেড়ে সিংহল, বর্মা, মরিশাস প্রভৃতি বিদেশে পাড়ি দিতে থাকে।
আরো পড়ুন-অবশিল্পায়ন কাকে বলে এবং এর কারণ গুলি আলোচনা করো। Click here
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন