উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস
তৃতীয় অধ্যায়
৮ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
প্রশ্ন,
অব-শিল্পায়ন বলতে কী বোঝো ও এর কারণ গুলি আলোচনা করো।
অবশিল্পায়ন:- অবশিল্পায়নের আক্ষরিক অর্থ হল- শিল্পের অবনমন বা শিল্পের অধোগতি। অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় মূলত শিল্পায়নের বিপরীতমুখী ধারা অর্থাৎ অর্থনীতিতে যদি শিল্পের গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং একইসঙ্গে কৃষির গুরুত্ব বাড়তে থাকে তবে তা অবশিল্পায়ন হিসেবে ধরা হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে একদিকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব, কোম্পানির অসম শুল্ক নীতি ও অত্যাচার এবং অন্যদিকে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির অবক্ষয়ের ফলে বাংলার তাঁত-বস্ত্রশিল্পসহ অন্য শিল্পের কারিগররা ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, একেই- অবশিল্পায়ন বলা হয়।
অবশিল্পায়নের কারণ:-
অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে পর থেকে একাধিক কারণ লক্ষ্য করা যায়, যার ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবশিল্পায়ন ঘটেছিল। এই অবশিল্পায়ন মূলত একাধিক কারণে ভারতে দেখা দিয়েছিল। এই কারণগুলি হল নিম্নরূপ-
১) দেশীয় অভিজাত শ্রেণীর অবক্ষয়ঃ-
অষ্টাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং দেশীয় রাজাদের ক্ষমতার অবলুপ্তি তাদের ওপর নির্ভরশীল অভিজাত শ্রেণীকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল । এরাই ছিল দেশের সৌখিন বস্ত্রশিল্পের ক্রেতা। ফলে উচ্চমানের সৌখিন বস্ত্রের বাজার নষ্ট হয়ে যায়।
২)অসম শুল্কনীতিঃ- ইংল্যান্ড তথা ইউরােপের অন্য দেশগুলিতে ভারতীয় বস্ত্র মূলত ক্যালিকো ও মসলিনের বিপুল চাহিদা ছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর থেকে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে বস্ত্র আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ১৮১৩ খ্রিঃ বাংলার মসলিনের ওপর ৪৪% এবং ক্যালিকো কাপড়ের ওপর ৮৬% আমদানি শুল্ক ধার্য করা হয়।
৩) কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যনীতিঃ-
বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানি ব্রিটিশ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটায়। দেওয়ানি লাভের পর শুরু হয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্যের যুগ। Adam Smith- 'Wealth of Nation' গ্রন্থে লিখেছেন – ভারতের অভ্যন্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার কায়েম ছিল ভারতীয় স্বার্থবিরোধী। যার ফলে কোম্পানির সাথে দেশীয় বাণিজ্য পেরে উঠছিল না। ফলে দেশীয় শিল্প বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অবশিল্পায়ন দেখা দেয়।
৪) মূলধনের অভাবঃ-
অষ্টাদশ শতকে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার ঘটিয়ে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটানাে সম্ভব হয়েছিল মূলধনের জোগান থাকায়।কিন্তু, ভারতে মূলধনের জোগান দেওয়া তাে দূরের কথা এদেশের অর্থ ও সম্পদকে কোম্পানি নিংড়ে শােষণ করে নিয়েছিল। ফলে মূলধনের অভাবে অবশিল্পায়ন ছিল এক অবশ্যম্ভাবী ঘটনা।
৫) মহাদেশীয় অবরােধঃ- নেপােলিয়ন বােনাপার্ট ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কোনঠাসা করার জন্য মহাদেশীয় অবরােধ ঘােষণা করেন। ফলে ইউরােপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, যার দরুন ১৮০৮খ্রিঃ – ১৮০৯ খ্রিঃ মধ্যে ভারতীয় পণ্যের রপ্তানির হার খুব হ্রাস পায়।
উপসংহার- পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজদের একের পর দেশীয় রাজ্য দখল ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়ন্ত্রন স্থাপন, ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রকে কার্যত অনাথ ও অভিভাবকহীন করে দেয়। ফলে ভারতের শিল্প বানিজ্যের স্বার্থ রক্ষাকারী কোনাে শিল্প সংস্থা বা আর্থিক সংগঠন না থাকায় খুব সহজেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে। যার ফলে ধীরে ধীরে ভারতীয় শিল্প গুলি হারিয়ে যেতে থাকে।
আরো পড়ুন:- অবশিল্পায়ন কাকে বলে এবং এর ফলাফল বা প্রভাব আলোচনা করো। Click here
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন