উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস
8 নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
তৃতীয় অধ্যায়
প্রশ্ন,
চীনে ৪ঠা মে আন্দোলন ও তার গুরুত্ব আলোচনা করো।
অথবা
চৌঠা মে আন্দোলনের সূচনা ও গতি প্রকৃতি।
অথবা
চৌঠা মে আন্দোলনের চরিত্র বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
চৌঠা মে আন্দোলনঃ-
পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক 'চেন-তু-শিউর' আহ্বানে হাজার হাজার ছাত্র ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ ঠা মে পিকিং- এর 'তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ার'-এ জড়াে হয়ে বিদেশি শক্তির অপসারণ, বিভিন্ন অসম চুক্তি বাতিল, দেশদ্রোহীদের শাস্তি, জাপানি ২১ দফা দাবী ও পণ্য বয়কট প্রভৃতির দাবিতে চীনের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ দেখায়। এই ঘটনা ইতিহাসে 'চৌঠা মে আন্দোলন' বা 'মে ফোর্থ আন্দোলন' নামে পরিচিত।
আন্দোলনের কারণ
চৌঠা মে আন্দোলনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ লক্ষ্য করা যায়। এই কারণ গুলি দুটি ভাগে বিভক্ত যথা- (i)প্রত্যক্ষ কারণ এবং (ii) পরোক্ষ কারণ।
১) প্রত্যক্ষ কারণ-
চিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষে যােগ দেয়। চিন আশা করেছিল যে, এর ফলে মিত্রপক্ষ যুদ্ধে জয়লাভ করলে বিদেশিদের কাছ থেকে চিন তার রাজ্যাংশগুলি ফেরত পাবে এবং বিদেশিদের সঙ্গে অসম চুক্তিগুলি বাতিল হবে। যুদ্ধাবসানের পর চিন প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে (১৯১৯ খ্রি.) 'একুশ দফা দাবি'-সহ সব অসম চুক্তি এবং শান্টুং প্রদেশে জাপানি কর্তৃত্ব বাতিলের দাবি জানায়। কিন্তু ইউরােপীয় কর্তৃপক্ষ চিনের আবেদনে কর্ণপাত করেননি। কারণ তাদের মতে, চিনের দাবিগুলি ছিল 'আলােচনা বহির্ভূত' বিষয়। ফলে চিনের প্রতিনিধিরা শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসেন।এমতাবস্থায় শুষ্ক মুখে দেশে ফিরলে ১৯১৯ খ্রিঃ ৪ঠা মে পিকিং এর "তিয়েন-আন -মেন স্কোয়ারে" চিনা জাতীয়তাবাদের প্রবল বিস্ফোরন ঘটে এবং গন আন্দোলন শুরু হয়।
২) পরোক্ষ কারণ-
চীনে একাধিক পরোক্ষ কারণও দেখা দিয়েছিল যার দরুন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে এই 'মে ফোর্থ আন্দোলন' সংঘটিত হয়। এই পরোক্ষ কারণগুলি হল নিম্নরূপ-
(i) হিউয়ান-শি-কাই' এর নৃশংসতা ও একনায়কতন্ত্র:-
চিনা রাষ্ট্রপতি 'হিউয়ান-শি-কাই' চীনের সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চীনের সমস্ত সাংবিধানিক রীতিনীতি বাতিল করেন এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে অপমানজনক শর্তে ঋণ নিতে রাজি হন। এছাড়াও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার তিনি কেড়ে নেন, কেউ তার বিরোধিতা করলে তিনি সেই বিরোধীদেরকে নিশংস ভাবে হত্যা করেন
(ii) জাপানের একুশ দফা দাবি:-
১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জার্মানি চীনের শান্টুং প্রদেশে দখল করে। তখন সেখানে জাপান গিয়ে জার্মানির সেনাকে হটিয়ে দিয়ে চীনের শান্টুং প্রদেশের নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে এবং তারা সমগ্র চীনকে নিজেদের উপনিবেশ হিসাবে দাবী করে। এরপর ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ১৮ই জানুয়ারি চীন সরকারের কাছে জাপান '২১- দফা দাবি' পেশ করল। ফলস্বরূপ গোটা দেশজুড়ে ২১ দফা দাবির প্রতিবাদ শুরু হলো।
(iii) ইউয়ানের গোপন চুক্তি ও গণ- আন্দোলন:-
'হিউয়ান-শি-কাই' জাপানের সাথে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যে চুক্তি অনুযায়ী তিনি পুনরায় চীনের প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্রের সূচনা করে নিজেই সমগ্র চীনের অধিকার কায়েম করতে চান এবং নিজে চীনের সম্রাট হতে চান। এতে 'হিউয়ান শি কাই' কে সমস্ত প্রকার সাহায্য জাপান। এই জন্যই তিনি তার দেশের জনগণকে জাপানের বিরুদ্ধে পণ্য বয়কট আন্দোলনের দাবি প্রত্যাহার করতে বলেছিলেন।এসব ঘটনার বিরুদ্ধে চিনে তীব্র জনরােষের সৃষ্টি হয়।
(iv) বিদেশি পণ্যের বাজার:-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চিনে চিনে বিদেশি পণ্যের প্রবেশ যথেষ্ট পরিমাণে কমে যায়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে জাপান-সহ অন্যান্য পুঁজিপতি দেশগুলি আবার চিনের অভ্যন্তরে বাজার দখলের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে। ফলে চিনের সদ্যোজাত শিল্পগুলি তাদের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায়।
• উপরিউক্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ গুলির জন্য চীনে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে 'চৌঠা মে আন্দোলন' সংঘটিত হয়েছিল।
আন্দোলনের সূচনা ও গতিপ্রকৃতি-
মে ফোর্থ আন্দোলনের সূচনা ও গতি প্রকৃতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মূলত এই সময় ছাত্র ও যুব সমাজ ব্যাপক ভাবে এই আন্দোলনকে চরমতম মাত্রায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিল।
(i) বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও ছাত্রদের আন্দোলনের ডাক :-
প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে চিন মিত্রপক্ষে যোগ দেওয়া সত্ত্বেও তাদের কোনো দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হলো না। এই কারণে যখন চীনের প্রতিনিধিরা তাদের দেশে ফিরে এলেন শূন্য হাতে, সেই মুহূর্তে চীনের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও পিকিং- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অপদার্থ দেশীয় শাসক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ডাক দেন। তারা সকলে একজোট হয়ে 21 দফা দাবির সম্মতিপত্রে সই করা দেশদ্রোহী মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। এই ঘটনার ফলে সেই মন্ত্রী কর্তৃক চীনের পুলিশি শাসনব্যবস্থা দাঁড়া দমানোর চেষ্টা করা হয় চীনের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও ছাত্র যুব সমাজকে। কিন্তু, তা সত্বেও ছাত্রদের দমানো সম্ভব হয় না। এরপর সরকার কর্তৃক পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য 'চেন-তু-শিউয়ের' পদত্যাগ ঘটানো হয় । যার ফলে ছাত্ররা 'জিউগুয়ো' স্লোগান তুলে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
(ii) শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর যোগদান :-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জাপান সহ আরো অন্যান্য বিদেশি শক্তিগুলি চীনে এসে চীনের বাজার দখল করে। যার ফলে দেশীয় শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী- বণিকরা সংকটের মুখে পড়ে। সেই কারণে এই আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যোগ দিয়েছিল। এছাড়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও ব্যাবসায়ীরা বয়কট সহ নানা প্রতিবাদী আন্দোলনে সামিল হয়।
মে ফোর্থ আন্দোলনের গুরুত্ব:-
চীনের ইতিহাসে চৌঠা মে আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
(i) এই আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য চীনের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। এই আন্দোলন চীনদেশে প্রবল দেশাত্মবোধের সঞ্চার করে। এই আন্দোলনের জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল- 'জিউগুও' অর্থাৎ দেশ বাঁচাও।
(ii) চৌঠা মে আন্দোলন চীনের আধুনিকতার বিকাশ ঘটায়। চীনের আধুনিকীকরণের প্রকৃত সূচনা এই চৌঠা মে আন্দোলনের পর থেকেই হয়। এ থেকে বলা যায় চৌঠা মে আন্দোলন চীনের আধুনিকতার পথ প্রশস্ত করেছিল।
(iii) এই আন্দোলনের তীব্র চাপের ফলে শেষ পর্যন্ত চীন সরকার প্যারিস সম্মেলনে উল্লেখিত 'ভার্সাই সন্ধিতে' স্বাক্ষর করে না।
(iv)১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে এই আন্দোলন পরবর্তীতে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ওয়াশিংটন কনফারেন্সের আহ্বান করেছিল। কারণ বিদেশী শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছিল চীনের এক গভীর ক্ষতর সৃষ্টি হয়েছে। তাই তাদের ক্ষততে প্রলেপ দেওয়ার দরকার রয়েছে, এই অনুযায়ী ওয়াশিংটন কনফারেন্স আহ্বান করা হয়েছিল ।
(v) চৌঠা মে আন্দোলন চীনের জনগণ অর্থাৎ ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, শ্রমিকশ্রেণী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি একত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারা দেশপ্রেম ও নিজস্ব জাতীয়তাবাদে উদবুদ্ধ হয়।
(vi) এই আন্দোলন চীনের নিজস্ব সংস্কৃতির পথ প্রশস্ত করে। সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে জ্ঞান চর্চা থেকে জাতীয়তাবাদের প্রচারের চেষ্টা করা হয় এবং চীনের ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি হয়।
(vii) এই আন্দোলনে চিনের শ্রমিক শ্রেণী রাজনৈতিক সংগ্রামে প্রবেশ করে এবং পুনরায় কুয়ােমিনতাং দলের পুনর্গঠন হয় ও কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান ঘটে ।
(viii) এই আন্দোলন বহু বইপত্র ও পত্র পত্রিকা প্রকাশ ও সাহিত্য রচনার মাধ্যমে চিনের সাংস্কৃতিক জাগরন ঘটায়। পুরাতন ধ্যান ধারনার বদলে আধুনিক মতাদর্শ ও চিন্তা ভাবনার প্রসার ঘটে।
(ix) এই আন্দোলন থেকে চিনা জনগন উপলব্ধি করে স্বদেশের স্বাধীনতা। অখন্ডতা বজায় রাখতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা জরুরি। আর এই আন্দোলন একমাত্র সংগঠিত করতে পারে মার্কসীয় মতাদর্শ। রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র অপেক্ষা সমাজতন্ত্রই মুক্তির শেষ এবং একমাত্র পথ।
চৌঠা মে আন্দোলনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য-
চিনের মে ফোর্থ আন্দোলনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ছিলা বহুমুখী।
(i) প্রথম পর্বে এটি ছাত্র আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও অচিরেই তা গনআন্দোলনে পরিনত হয়।
(ii) জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরােধীতা ছিলাে এই গন আন্দোলনের মূল ভিত্তি অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী চরিত্র এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরােধী চরিত্র এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিলাে।
(iii) এই আন্দোলনের অর্থনৈতিক চরিত্রকেও অস্বীকার করা যায় না।বিদেশী শক্তি চিনের অর্থনীতিকে যেভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিলাে, তার বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেনী গুলি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং প্রতিবাদে সােচ্চার হয়।
(iv) সর্বোপরি, এই আন্দোলনের একটি সাংস্কৃতিক দিকও ছিলাে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নানা সৃষ্টিশীল রচনা, গান,মতাদর্শের চর্চা, পুস্তক ও পত্র পত্রিকার প্রকাশ চিনের সাংস্কৃতিক জাগরন ঘটায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন