Click Below

Breaking

Know more

Search

বৃহস্পতিবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২১

১৯৪৩ সালের বা পঞ্চাশের মন্বন্তরের কারণ, ফলাফল ও ভয়াবহতা আলোচনা করো।

 













দ্বাদশ শ্রেণী


উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস 8 নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ বড়প্রশ্ন






প্রশ্ন,

পঞ্চাশের মন্বন্তরের কারণ, ফলাফল ও ভয়াবহতা আলোচনা করো।

অথবা 

১৯৪৩ সালে বাংলার মন্বন্তরের কারণ উল্লেখ করো? এর ফলাফল ও ভয়াবহতা কি হয়েছিল?


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকারের তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ এর ফলে ১৯৫৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা যায় তা সেপ্টেম্বর মাসে চরম আকার ধারণ করে। প্রায় এক বছর ধরে দাপিয়ে এই মন্মন্তর বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করে। বাংলার মানুষ অনাহারে, অপুষ্টিতে কোনো খাবার খেতে না পেয়ে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অনুমান করা হয় বাংলায় প্রায় ৪০ থেকে ৭০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর বাংলা সাল অনুযায়ী ১৩৫০ বঙ্গাব্দে সংঘটিত হওয়ায় একে 'পঞ্চাশের মন্বন্তর' বলা হয়।


পঞ্চাশের মন্বন্তরের কারণ সমূহঃ- 

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের মদতে ইতিহাসে ১৯৪৩ সালে তথা পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু, তবুও অন্যান্য তত্ত্বের নিরিখে পঞ্চাশের মন্বন্তরের যে সমস্ত সম্ভাব্য কারণ গুলি খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলি হল-


১) খাদ্য সংকট ও খাদ্যের উৎপাদন হ্রাসঃ- 

অবিভক্ত বাংলায় ১৯৪০ সাল থেকেই সীমিত আকারে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের আগে বাংলায় ধানের উৎপাদন বিগত ১০ বছরের তুলনায় খুবই কম পরিমাণে হয়েছিল। যার কারণে ১৯৪০ সালের সীমিত আকারে খাদ্য সংকটের পরিমাণ ১৯৪৩ সালে গিয়ে বৃহৎ আকার ধারণ করে এবং দেখা দেয় পঞ্চাশের মন্বন্তরের ।


২) প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের ফলে খাদ্য সংকটঃ- 

১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে হওয়া ঘূর্ণিঝড়,বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস এর ফলে বাংলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে যে সমস্ত সামান্য পরিমাণে খাদ্যশস্য রক্ষা পায় সেগুলোতেও বাদামি ছত্রাক ধরে নষ্ট হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই গবাদিপশুর বহুদিন ধরে অভুক্ত থাকায় কর্ম ক্ষমতা হারায়। যা চাষের কাজ ব্যাহত করে, যার ফলে ১৯৪৩ সালে খাদ্য সংকট ও পঞ্চাশের মন্বন্তর দেখা দিয়েছিল।


৩) খাদ্য সরবরাহ হ্রাসঃ- পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় খাদ্যের চাহিদার তুলনায় খাদ্যের যোগান এ ঘাটতি দেখা যায়। কোচিন, বোম্বাই, মাদ্রাজ এবং শ্রীলঙ্কায় খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় সেখানের খাদ্য ঘাটতি মেটাতে পাঞ্জাব ও অন্যান্য অঞ্চলের খাদ্য সেখানে পাঠানো হতো। ফলস্বরূপ বাংলায় খাদ্য আমদানি কমে যায়। অন্যদিকে বর্মা থেকে চাল আমদানি বন্ধ হলে বাংলায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা যায়।


৪) জাপানের ভারত আক্রমণের আশঙ্কাঃ-  ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আসন্ন জাপান আক্রমণ প্রতিহত করার 'পোড়ামাটি নীতি' নিয়ে নৌকা, মোটরযান, গরুর গাড়ি সবকিছু ধ্বংস হলে বাংলায় খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। যা খাদ্য সঙ্কটকে আরও তীব্র করে।


৫) সরকারের নীতি ও চার্চিলের ভূমিকাঃ- 

পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় সরকার অন্য প্রদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে খাদ্য সংকটের মোকাবিলা করতে পারতো কিন্তু তারা তা করেনি। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা খাদ্য রপ্তানিতে উদ্যোগী হলেও কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের বাণিজ্য গন্ডির কারণে তারা তা করতে ব্যর্থ হয়। বলতো খাদ্য আমদানি বন্ধ হলে খাদ্যের মজুদ ভান্ডার শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাংলা দুর্যোগের দিনে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা খাদ্যশস্য পূর্ণ জাহাজ ভারতে পাঠাতে চাইলেও যুদ্ধের কারনে জাহাজ সংকট অজুহাত দেখিয়ে- চার্চিল খাদ্য পরিবহনকারী জাহাজ কে ভারতে পাঠায়নি। চার্চিলের এই অমানবিক মনোভাব খাদ্য সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে দেয়।


৬) মজুদদারি ও খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধিঃ- 

ভারতে আসন্ন জাপান আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত সেনাদলের খাবার জোগান রাখার উদ্দেশ্যে সরকার প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুদ করে রেখেছিল। অন্যদিকে আগাম খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস পেয়ে বহু ব্যবসায় প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য কিনে নিজের গুদামে মজুদ করে রাখে। সরকার এই বেআইনী মজুদ করা খাদ্যের বন্টনের কোনো ব্যবস্থা করেনি ফলে- খাদ্য সংকট চরমে ওঠে। খাদ্য সঙ্কটের তীব্রতায় খাদ্যশস্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। এর ফলে গ্রাম বাংলার মানুষ খাদ্য ক্রয় করতে না পেরে, অভুক্ত হয়ে থাকে।


• পঞ্চাশের মন্বন্তরের ভয়াবহতাঃ- 

১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। মানুষ খিদের জ্বালায় পাগল হয়ে নিজের পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তান হত্যা করতে বাধ্য হতো। যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মৃত্যুর শ্মশানে পরিণত হয় গ্রামের পর গ্রাম। সরকার দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করার জন্য কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেয়নি। ফলত ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর চূড়ান্ত আকার ধারণ করে।


• পঞ্চাশের মন্বন্তরের ফলাফলঃ- 

১৯৪৩ সালে ঘটা পঞ্চাশের মন্বন্তরের চিত্রটি খুবই দুঃখজনক একটি ঘটনা। এই পঞ্চাশের মন্বন্তরের একাধিক ফল লক্ষণীয় ছিল। যথা:-


১) মৃত্যু মিছিলঃ- পঞ্চাশের মন্বন্তরে অনাহারে প্রায় ৪০-৭০ লক্ষেরও বেশী মানুষ মারা যায়। রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে মৃতদেহ স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়।


২) মানবিক বিপর্যয়ঃ- দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার্ত মানুষ অখাদ্য পশুর মাংস এবং এমনকি কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে ডাস্টবিন থেকে খাবার নিয়ে খেত। সামান্য খাবারের জন্য ও তার পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর জন্য মানুষ যেকোনো কাজ করতে রাজি ছিল। কখনো আবার মানুষ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেত খাবারের সন্ধানে।


৩) অর্থনৈতিক বিপর্যয়ঃ- শেষ পর্যন্ত দরিদ্র মানুষ তার সহায় সম্বল- ভিটেমাটি বিক্রি করে, খাদ্য ক্রয় করে নিজের জীবন বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ভিটেমাটি বিক্রি করা অর্থ দিয়ে সামান্য পরিমাণ খাদ্য কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলেই মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন হিসাবে বেছে নেয়।


৪) খাদ্য সরবরাহঃ- দেরিতে হলেও শেষমেষ এই পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরিনাম দেখে সরকার দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য শহরে কয়েকটি ন্যায্যমূল্যের দোকান খোলে। যেখানে স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী মিলতে শুরু করে। এর সাথে সাথেই সরকার ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে খাদ্য আমদানি করতে শুরু করে।


৫) কমিশন গঠনঃ- দুর্ভিক্ষের পর সরকার দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধান ও দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা নির্ধারণ করার জন্য- 'দুর্ভিক্ষ অনুসন্ধান কমিশন' গঠন করেছিল। যে কমিশন তার অনুসন্ধান চালানোর পর রিপোর্ট পেশ করেছিল।


৬) শিল্প-সাহিত্যের সৃষ্টিঃ- পঞ্চাশের মন্বন্তর এর ফলে এই পঞ্চাশের মন্বন্তর কে উদ্দেশ্য করে একাধিক নাটক, শিল্প ও সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন- বিজন ভট্টাচার্যের- 'নবান্ন' নাটক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অশনি সংকেত' , অমলেন্দু চক্রবর্তীর- 'অকালের সন্ধানে' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বেশ কিছু চিত্র ফুটে ওঠে পঞ্চাশের মন্বন্তরের। এর সাথে সাথে বিভিন্ন গ্রন্থ এই পঞ্চাশের মন্বন্তর সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছিল।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here