উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস
দ্বাদশ শ্রেণি
তৃতীয় অধ্যায়
গুরুত্বপূর্ণ ৮ নম্বরের বড় প্রশ্ন
প্রশ্ন,
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে জয় এবং ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে শাসন ব্যবস্থাকে নিজেদের মতো করে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছিল। তাদের এই বিভিন্ন নীতি গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল 'ভূমি রাজস্ব নীতি'।
ওয়ারেন হেস্টিংস, লর্ড কর্নওয়ালিস, টমাস মনরো প্রমুখেরা এ দেশে বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করে।
বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব নীতিঃ-
কোম্পানির বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব নীতি গুলি হল-
১) পাঁচশালা বন্দোবস্ত।
২) একসালা বন্দোবস্ত।
৩) দশসালা বন্দোবস্ত।
৪) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
৫) রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত।
৬) মহলওয়ারি বন্দোবস্ত।
৭) ভাইয়াচারী বন্দোবস্ত।
পাঁচশালা বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ- ওয়ারেন হেস্টিংস এই ভূমি রাজস্ব নীতি চালু করেন ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে।
মূল বিষয়ঃ- রাজস্ব আদায়ের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংস একটি 'ভ্রাম্যমাণ কমিটি' গঠন করেন। যেখানে কমিটি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে যে ইজারাদার কোম্পানিকে বেশি অর্থ বা রাজস্ব দিতো তাকে পাঁচ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করে দিত।
ত্রুটিঃ- পাঁচশালা বন্দোবস্ত একাধিক ত্রুটি ছিল। যথা-
১) এই ব্যবস্থায় কম্পানি আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
২) ইজারাদার এরা তাদের লোভের ও লাভের জন্য প্রজাদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করত।
একসালা বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ-১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস এই ব্যবস্থা টি চালু করেন।
মূল বিষয়ঃ- পাঁচশালা বন্দোবস্তের ত্রুটি গুলি দূর করার জন্য হেস্টিংস পাঁচশালা বন্দোবস্ত বাতিল করে, ইজারাদারদের প্রতিবছর জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ার প্রথা চালু করেন এবং তার নাম দেওয়া হয় একসালা বন্দোবস্ত।
ত্রুটিঃ- ১) এই বন্দোবস্তে রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি।
২) এক বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ায় জমিদাররা সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে পারত না।
দশশালা বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ- লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ও বিহার এবং ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যায় এই ব্যবস্থা চালু করে।
মূল বিষয়ঃ- নিজে জমিদার হওয়ায় কর্নওয়ালিস এদেশে এসে দীর্ঘমেয়াদি জমি বন্দোবস্তের উদ্যোগ নেন। তাই পূর্বের একশালা বন্দোবস্তকে তুলে দিয়ে, তিনি জমিদারদের সঙ্গে 10 বছরের ভিত্তিতে রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করে।
ত্রুটিঃ- দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় এই ব্যবস্থার দ্বারা জমিদারেরা নিজেদের ইচ্ছামত রাজস্ব বাড়িয়ে প্রজা শাসন করতেন।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ- ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা-বিহার-উরষ্যায় এই বন্দোবস্ত চালু করেন।
মূল বিষয়ঃ- জমিদারেরা যাতে জমির দিকে যথাযথভাবে নজর দেয় সেই জন্য কর্নওয়ালিস চিরদিনের জন্য জমিদারদের সাথে রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করে। যেখানে বলা হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা দিয়ে জমিদাররা বংশানুক্রমিক ভাবে তাদের জমিদারী ভোগ করবেন।এছাড়া আরও বলা হয় নির্দিষ্ট দিনের 'সূর্যাস্ত'এর আগেই সরকারকে রাজস্ব দিতে হবে। খরা অথবা বন্যা ইত্যাদিতে রাজস্ব মুকুব করা হবে না।
ত্রুটিঃ-১) এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকরা তাদের জমির মালিকানা হারান।
২) জমিদারদের শ্বসনের ফলে প্রজারা অত্যাচারের যন্ত্রে পরিণত হয়।
রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ-১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আলেকজান্ডার রিড ও স্যার টমাস মনরো এই ব্যবস্থা চালু করেন।
মূল বিষয়ঃ- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ত্রুটি গুলো লক্ষ্য রেখে কোম্পানি সরাসরি রায়ত অর্থাৎ কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেয়। এই বন্দোবস্তে ৩০-৪০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদী শর্তে জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়া হতো। কৃষকেরা সরাসরি সরকারকে রাজস্ব দিত।
ত্রুটিঃ- ১) এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার অত্যন্ত উঁচু ছিল।
২) প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয়ে খাজনা মুকুব করা হতো না।
মহলওয়ারি বন্দোবস্ত
প্রবর্তকঃ-১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর পশ্চিম ভারতে এলফিনস্টোন এর উদ্যোগে এই ব্যবস্থা চালু হয়।
মূল বিষয়ঃ- এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানির নির্দিষ্ট অঞ্চল কে চিহ্নিত করে তাকে মহল বা এলাকা বলে গণ্য করতো। যেখানে একজন বা কয়েকজন ব্যক্তির কাছে রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হতো।
ত্রুটিঃ- ১) এই ব্যবস্থায় জমির উপর কৃষকদের মালিকানা স্বীকার করা হয়নি।
২) এতে রাজস্বের হাট ছিল অত্যন্ত বেশি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন