উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস
দ্বাদশ শ্রেণি
পঞ্চম অধ্যায়ঃ ঔপনিবেশিক ভারতের শাসন
৮ নাম্বারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
প্রশ্ন,
ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে লর্ড ওয়েলেসলির 'অধীনতামূলক মিত্রতা' নীতির বর্ণনা করো।
ভূমিকা - ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে যেসব ব্রিটিশ শাসকদের অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল- লর্ড ওয়েলেসলি। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে তার সাত বছরের শাসন কাল(১৭৯৮-১৮০৫ খ্রিস্টাব্দ) এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তার শাসনকালে এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে ও সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রবর্তন-
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কে বৃস্তিত করার উদ্দেশ্যে এবং সুশাসন প্রবর্তনের জন্য 'লর্ড ওয়েলেসলি' ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে 'অধীনতামূলক মিত্রতা' নীতি নামে একটি ফাঁদ তৈরি করেন। এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে বহু দেশীয় রাজ্য এবং সেই সকল দেশীয় রাজ্যগুলি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
• অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শর্তাবলী-
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী রাজ্যগুলির কাছ থেকে লর্ড ওয়েলেসলি কিছু শর্ত রেখেছিলেন। যে শর্ত গুলি আসলে বসতা স্বীকারের নামান্তর ছিল।
১) সেনাদল- এই নীতি গ্রহণকারী রাজ্যটিতে একদল ইংরেজ সৈন্য রাখতে হবে।
২) সেনাদের ব্যায়- দেশীয় রাজ্য গুলিতে যে সেনাদল থাকবে রাজ্যের রাজা তার ব্যয় ভার বহন করবে অথবা ব্যয়ভার বহনের পরিবর্তে রাজ্যের একাংশ ব্রিটিশ সরকারকে ছেড়ে দিতে হবে।
৩) রেসিডেন্ট নিয়োগ- অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী বা চুক্তিতে আবদ্ধ কারী রাজ্যটিতে একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট বা প্রতিনিধি থাকবেন। যার কাজ হবে মূলত সেই দেশীয় রাজ্যের সমস্ত খবরা খবর ইংরেজদের কাছে প্রেরন করা। কিন্তু, গোপনীয় ভাবে দেশীয় রাজ্য কে না জানিয়ে ইংরেজদের হয়ে সেই দেশীয় রাজ্যের শাসন ক্ষমতা ধীরে ধীরে দখল করা ছিল এই প্রতিনিধির প্রধান কাজ।
৪) বৈদেশিক নীতি- অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী রাজ্যটি কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য কোন শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ অথবা মিত্রতা আবদ্ধ হতে পারবে না।
৫) রাজ্যের নিরাপত্তা- অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী রাজ্যটি সামগ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে ব্রিটিশ কোম্পানি।
৬) কর্মচারী নিয়োগে বাধা- কোম্পানির শর্ত গুলি মেনে চলা দেশীয় রাজ্যে ইংরেজ কর্মচারী বাদে অন্য কোন কর্মচারী নিয়োগ করা যাবে না।
রাজ্য দখলের ফাঁদ- ওয়েলেসলি দেশীয় রাজ্যগুলির কাছে উক্ত প্রস্তাব রেখে বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছিলেন। যা ছিল মিত্রতা নীতির ছলনায় দেশীয় রাজ্যগুলির ইংরেজদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করার এক গোপন পরিকল্পনা।
নীতির প্রয়োগ ও রাজ্য দখল- দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে হায়দ্রাবাদের- 'নিজাম' (১৭৯৮ খ্রি:) প্রথম এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর সুরাট (১৭৯৮), তাঞ্জোর(১৪০০), কর্ণাটক (১৮০১), অযোধ্যা (১৮০১), মারাঠা (১৮০২) এই নীতিতে স্বাক্ষর করে। এছাড়া মালব, উদয়পুর, যোধপুর, জয়পুর প্রভৃতি রাজ্যগুলি একে একে এই নীতিতে স্বাক্ষর করে। টিপু সুলতান এই নীতি গ্রহণ করতে না চাইলে ওয়েলেসলি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নীতি গ্রহণ করেন এবং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে মহিষাসুর রাজ্য জয় করে ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
• অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রভাব বা ফলাফল-
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রভাব বা ফলাফলগুলি বিচার করতে গেলে এই নীতির দুটি দিক সামনে উঠে আসে। একটি হলো ইতিবাচক দিক এবং অন্যটি হলো নেতিবাচক দিক। ইতিবাচক দৃষ্টিতে ইংরেজদের তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এই নীতির ফলাফল ছিল ব্যাপক সুবিধাজনক। কিন্তু, নেতিবাচক দিক থেকে বিচার করলে দেশীয় রাজ্যের উপর এই নীতির প্রভাব ছিল খুবই খারাপ।
(i) দেশীয় রাজ্যের উপর প্রভাব- নীতিটির প্রয়োগের ফলে দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের স্বাধীনতার বিসর্জন দেয়। দেশ ও কৃষকদের উপর অধিক হারে কর চাপানো হয় এবং দেশীয় সেনারা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে।
(ii) ব্রিটিশদের কাছে প্রভাব- দেশি ওদের কাছে যেমন নীতিটি দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তেমনি কোম্পানির কাছে এই নীতিটি ব্যাপক সুবিধাজনক ছিল। এই নীতির ফলে কোম্পানির শক্তি ও সম্পদ দুই বেড়ে যায়। কোম্পানি তাদের সেনাদের ব্যয় বহনের সুবিধা পান দেশীয় রাজ্যগুলির কাছ থেকে এবং দেশীয় রাজ্যগুলি কোম্পানির অধীনে থাকায় তাদের নিরাপত্তা সুদৃঢ় হয়।
এছাড়াও এই অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির আরো বেশ কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যথা- এই নীতি গ্রহণ করায় দেশীয় রাজ্যগুলি পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে আর ঐক্যবদ্ধ ভাবে থাকতে পারে না, কেননা তারা নীতির স্বাক্ষর এর সময় নীতির শর্ত অনুযায়ী অন্য কোন দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা রাখতে পারবে না। যার কারণে দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে ঐক্য নষ্ট হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন