উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস
তৃতীয় অধ্যায়ঃ ঔপনিবেশিক কৃতিত্বের প্রকৃতি।
(৮ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন)
প্রশ্ন,
ইংরেজদের সাথে সিরাজের বিরোধের কারণ কি?
Or
পলাশীর যুদ্ধের কারণ কি ছিল?
or
পলাশীর যুদ্ধ থেকে বক্সার যুদ্ধ কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
Or
পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের তুলনামূলক আলোচনা করো।
সূচনা- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে তাদের সাম্রাজ্যর প্রতিষ্ঠায় যে সমস্ত দেশীয় শক্তিগুলি বিরোধের মুখে পড়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর 1756 খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলা সিংহাসনে বসেন। কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানির সাথে তার বিরোধ ঘটে, যার পরিণতিতে হয় পলাশীর যুদ্ধ।(1757খ্রি:)
•ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের বিরোধের কারণ /or/ পলাশীর যুদ্ধের কারণ:-
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে একাধিক কারণে বিরোধ সৃষ্টি হয়। যথা-
১) উপঢৌকন না দেওয়া- সিরাজ যখন নবাব পদে বসেছিলেন প্রথা অনুযায়ী অনুগত্য জানিয়ে ফরাসি ওলন্দাজরা উপলক্ষণ পাঠালেও, ইংরেজরা তা পাঠায়নি। এতে সিরাজ অপমানিত বোধ করেন।
২) ষড়যন্ত্র- সিরাজ সিংহাসনে বসার পর তাঁর সিংহাসন লাভের বিরোধিতা করে ঘষেটি বেগম, সৈকত জঙ্ প্রমুখেরা ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। যা সিরাজকে ক্ষিপ্ত করে।
৩) কৃষ্ণদাসকে আশ্রয়দান- ঘষেটি বেগমের প্রিয় পাত্র রাজবল্লভের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের কথা সামনে উঠে এলে। সিরাজ রাজবল্লভ কে সব হিসেব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলে রাজবল্লভ তার পুত্র কৃষ্ণদাস সহ প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে যান। ইংরেজদের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা -কৃষ্ণদাসকে ফিরিয়ে দেওয়ায় কথা বললেও ইংরেজরা তা দেয়নি।
৪) দুর্গ নির্মাণ- বাংলায় ফরাসী ও ইংরেজ উভয় শক্তির যুদ্ধের অজুহাতে দুর্গ নির্মাণ শুরু করে এমত অবস্থায় সিরাজের নিষেধ ফরাসিরা শুনলেও ইংরেজরা নির্দেশ উপেক্ষা করে দুর্গ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যায়।
৫) অন্যান্য কারণ সমূহ-
(ক) ইংরেজরা সিরাজের নির্দেশ উপেক্ষা করে দস্তকের অপব্যবহার করে বিনাশুল্কে বাণিজ্য শুরু করে।
(খ) সিরাজের প্রেরিত দূত নারায়ন দাসকে অপমানজনক ভাবে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন।
•পলাশীর যুদ্ধের সূচনা-
উপরিউক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিরাজ ও ইংরেজদের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠে যায়। যার পরিণতিতে কোম্পানির সেনাপতি ক্লাইভ- নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করলে নদীর পলাশীতে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় 1757 খ্রিস্টাব্দের 23 শে জুন। এই যুদ্ধই ইতিহাসে 'পলাশীর যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
• পলাশীর যুদ্ধের থেকেও বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব /or/ পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের তুলনামূলক আলোচনা-
ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যঃ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধের চেয়েও 1764 খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১) সাম্রাজ্যের প্রকৃত ভিত্তি- পলাশীর যুদ্ধের ফলে ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়, বক্সারের যুদ্ধ পতিষ্ঠিত হয়।
২) চূড়ান্ত বিষয়- পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা কেবল সিরাজ কে পরাজিত করেছিল, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজরা দিল্লির বাদশাহ শাহ্ আলমসহ বাংলার নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা কেও পরাজিত করে।
ঐতিহাসিক 'স্মিথ' বলেছেন-
"পলাশী ছিল কয়েকটি কামানের লড়াই,
বক্সার ছিল চূড়ান্ত বিষয়।।"
৩) বাংলায় আধিপত্য- পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হয়ে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির জয়যাত্রার সূচনা ঘটে। কিন্তু, বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলায় তারা চূড়ান্তরূপে অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। নবাব ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়।
৪) উত্তর ভারতে আধিপত্যের সূচনা- পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইংরেজরা তাদের প্রাধান্য বাংলা তেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু, বক্সারের যুদ্ধে জয়ী হবার ফলে কোম্পানির উত্তর ভারত বিজয় একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে যায়।
•∆ অর্থাৎ, এদেশে কোম্পানির ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ চেয়েও বক্সারের যুদ্ধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন