ট্রুম্যান নীতি - কি? মার্শাল পরিকল্পনার উদ্দেশ্য কি ছিল?
ট্রুম্যান নীতি (১৯৪৭, ১২ই মার্চ):- মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ ই মার্চ মার্কিন কংগ্রেসে এক বক্তৃতা দেন। প্রদত্ত এই বক্তৃতায় তিনি বলেন যে -
১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব - মুক্ত গণতান্ত্রিক দুনিয়াকে রাশিয়ার সাম্যবাদী অগ্রসন থেকে রক্ষা করা।
২) বিশ্বের যে কোনো দেশে সশস্ত্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা কোন বিদেশি রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবরকম সাহায্য করবে।
রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যানের এই ঘোষণা "ট্রুম্যান নীতি" নামে পরিচিত।
ট্রুম্যান নীতির গুরুত্ব:-
১) ট্রুম্যান নীতির মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ও কমিউনিস্ট প্রভাব খর্ব করা।
২) মার্কিন সাহায্যের মাধ্যমে গ্রিস ও তুরস্কে কমিউনিস্ট প্রভাব খর্ব করা হয়েছিল।
৩) ট্রুম্যান নীতি আমেরিকায় প্রচলিত নিরপেক্ষ বিদেশ নীতির পরিবর্তে আগ্রাসী বিদেশনীতির সূচনা করেছিল ।
৪) ট্রুম্যান নীতি ঠান্ডা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
মার্শাল পরিকল্পনা:- ট্রুম্যান নীতির পরিপূরক ছিল মার্শাল পরিকল্পনা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ট্রুম্যান নীতি ঘোষণার কয়েক মাস পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জর্জ সি. মার্শাল এক বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, যেখানে দারিদ্র, খুদা ও হাতাশা থাকে সেখানে কমিউনিজমের প্রসার ঘটে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের দারিদ্র দূর করতে না পারলে ইউরোপে সাম্যবাদের প্রসার রোধ করা যাবে না। এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আর্থিক পুনরুজীবনের উদ্দেশ্যে মার্শাল কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি তার বক্তৃতায় ইউরোপীয় পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা নামে কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন। মার্শালের নাম অনুসারে এই কর্মসূচি সাধারণভাবে মার্শাল পরিকল্পনা নামে পরিচিত।
মার্শাল পরিকল্পনার কারণ ও উদ্দেশ্য:-
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যেই মার্শাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় বলে আমেরিকা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু শুধু এই মানবিক দিক নয়, আরো কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকা মার্শাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল বলে বিভিন্ন পন্ডিত মনে করেন। যথা-
১) বাণিজ্যের প্রসার:- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে আমেরিকায় মুক্ত আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার প্রসার ঘটে। বিপুল পরিমাণ ঋণদানের মাধ্যমে ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে ওই অঞ্চলে মার্কিন ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটানোও মার্শাল পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
২) সাম্যবাদ ও রুশ অগ্রগতি প্রতিরোধ:- মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান ইউরোপে সাম্যবাদ ও রাশিয়ার অগ্রগতি প্রতিরোধ করার বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেন। তার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন হয়। মার্শাল পরিকল্পনায় ছিল সেই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ যার মাধ্যমে ট্রুম্যান নীতি সার্থকভাবে বাস্তবায়িত হয়। এক কথায়, মার্শাল পরিকল্পনা ছিল ট্রুম্যান নীতির অর্থনৈতিক দিক।
৩) অর্থনৈতিক সংকট:- যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজ, শিল্প উৎপাদন প্রভৃতি ব্যাহত হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে উৎপাদন কমে যায়। ব্রিটেনে প্রায় অর্ধেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৬ থেকে ৪৭ খ্রিস্টাব্দে কয়লা উৎপাদন অত্যন্ত কমে যাওয়া ইউরোপে জ্বালানি সংকট দেখা যায়।
৪) কমিউনিস্টদের অগ্রগতি:- অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ইউরোপে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের দ্রুতপ্রসার ঘটে। ফ্রান্সের অন্তত ৮০ শতাংশ শ্রমিক কমিউনিস্ট দলে যোগ দেয় এবং কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীরা যৌথ মন্ত্রিসভা গঠন করে।
৪) আমেরিকার উদ্বেগ:- সাম্যবাদী ভাবাদর্শ ও রুশ আধিপত্যের ক্রমাগত সম্প্রসারণের ফলে আমেরিকা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা আতঙ্কিত হয় যে সাম্যবাদের অগ্রগতি প্রতিরোধ করতে না পারলে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে শীঘ্রই রুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সামরিক দিক থেকে রাশিয়া সর্বশক্তিমান হয়ে উঠবে। ফলে মার্কিন নিরাপত্তা বিপদজনক পরিস্থিতি সম্মুখীন হবে।
৫) অনুগত রাষ্ট্রজোট গঠন:- ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে একটি অনুগত রাষ্ট্রজোট গঠন করা এবং সে সব দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব বিস্তার করাও মার্শাল পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
আরো পড়ুন:- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও? এই যুদ্ধকালীন অবস্থায় ভারতের ভূমিকা কি ছিল? CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন