উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস
সপ্তম অধ্যায় - ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগ
সাজেশন ভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর **
প্রশ্ন,
কোরিয়া যুদ্ধের বিবরণ দাও।
অথবা,
কোরিয়া যুদ্ধের কারণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করো?
উঃ- জাতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যে সমস্ত আন্তর্জাতিক ঘটনা - পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছিল তাদের মধ্যে 1950 খ্রিঃ সংঘটিত কোরিয়ার যুদ্ধ অন্যতম। এই যুদ্ধটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলেছিল এবং হতাহতের সংখ্যাও ছিল প্রচুর ।
সূত্রপাত : কোরিয়া ছিল চিন এবং জাপানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। 1910 সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত কোরিয়া ছিল জাপানের অধীনে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় এবং মিত্রশক্তির কাছে জাপান আত্মসমর্পণ করলে মিত্রশক্তি কোরিয়াকে 38° অক্ষরেখা বরাবর দুইভাগে বিভক্ত করে। এই 38° অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়ার উত্তরাংশে রাশিয়ার এবং দক্ষিণ অংশে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুই অংশে দুই দেশ নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয় এবং করিয়া ধীরে ধীরে ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্তনে জড়িয়ে পড়ে।
অস্থায়ী কমিশন গঠন : 1945 খ্রিঃ ডিসেম্বরে মস্কোয় সোভিয়েত রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বৈঠক হয় । যাতে ঠিক হয় কোরিয়ার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটি যুগ্ম কমিশন গঠন করা হবে। আরো বলা হয় এই কমিশন কোরিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করবে । কিন্তু এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে 1947 খ্রি: আমেরিকা জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে। জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় 9 জন সদস্য নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে। ভারতীয় কূটনীতিবিদ K.P.S. মেনন এই কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এই কমিশনের মূল দায়িত্ব ছিল কোরিয়ার বিদেশি সেনা অপসারণ করে একটি জা তা সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
কোরিয়ায় দুই সরকার প্রতিষ্ঠা : উত্তর কোরিয়া ছিল শিল্প প্রধান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ছিল কৃষি প্রধান । তাই কোরিয়ার সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন ছিল দুই কোরিয়ার ঐক্যবন্ধন । কিন্তু রাশিয়া ও আমেরিকার ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আবর্তে উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দুই পৃথক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় । সোভিয়েত রাশিয়া জাতিপুঞ্জের সদস্যদের উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করতে না দিলে 1948 খ্রিঃ 10 ই মে জাতিপুঞ্জের তত্বাবধানে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং 15ই আগস্ট সেখানেএকটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয় । এই সরকারের প্রধান হয়ে ছিলেন মার্কিন অনুগত ডঃ সিংম্যানরি । জাতিপুঞ্জ এই সরকারকে সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র বৈধ সরকার হিসাবে ঘোষণা করেন ও নাম দেন প্রজাতান্ত্রিক কোরিয়া যার রাজধানী ছিল সিওল। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ায় কমিউনিস্ট নেতা কিম উল সুং এর নেতৃত্বে 1948 সালের সেপ্টেম্বর মাসে সোভিয়েত অনুগামী একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় । এই সরকারের নাম দেওয়া হয় গণতান্ত্রিক কোরিয়া এবং রাজধানী হয় পানমুনজম।
যুদ্ধের সূচনা : দক্ষিণ কোরিয়াতে মার্কিন আধিপত্য রাশিয়া মেনে নিতে পারেনি। তাই 1950 খ্রিঃ 25 শে জুন রাশিয়ার মদতে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী 38°অক্ষরেখা অতিক্রম করলে উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় । জাতিপুঞ্জের কোরিয়া সংক্রান্ত কমিশন উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত করে এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে উত্তর কোরিয়ার সমগ্র সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি 1950 খ্রিঃ 25 শে জুন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রম্যান দক্ষিণ কোরিয়াকে সমস্ত রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং মার্কিন সেনাপতি ডগলাস ম্যাক আর্থারকে নৌ ও বিমান বাহিনী প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেন। 27 শে জুন নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে ঘোষণা করে ঘাষণা করে দক্ষিণ কোরিয়ার সার্বিক সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ৭ ই জুলাই নিরাপত্তা পরিষদ কোরিয়াতে জাতিপুঞ্জের সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । কিন্তু এই সেনাবাহিনীর মুখ্য অংশ ছিল মার্কিন বাহিনী । যার নেতৃত্বে ছিলেন ম্যাক আর্থার।
যুদ্ধের অগ্রগতি : জাতিপুঞ্জের বাহিনীর উদ্যোগ সত্বেও উত্তর কোরিয়া 1950 খ্রিঃ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় 95% ভূখণ্ড দখল করে নেয় । এই সময় যুদ্ধের বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য আমেরিকা নতুন করে সেনা পাঠায় ।জাতিপুঞ্জের বাহিনী আক্রমণের গতি বাড়িয়ে 30 শে সেপ্টেম্বর, 1950 এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার দখল থেকে মুক্ত করে এর ফলে জাতিপুঞ্জের নির্দেশ বাস্তবায়িত হয় । কিন্তু এই সময় ম্যাক আর্থার অতি উৎসাহের সাথে তার নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাদলসহ জয়ের আনন্দে 9 ই অক্টোবর 38° অক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করে এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে সমগ্র উত্তর কোরিয়া দখল করে চিন সীমান্তের ইয়ালু নদীর তীরে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি জটিল রূপ নেয়। কেননা চিনের ভূখণ্ডে জাতিপুঞ্জের নামে মার্কিন আধিপত্য মাওসেতুং মেনে নিতে রাজি ছিল না । চিন ও তার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে জাতিপুঞ্জের বাহিনীকে উত্তর কোরিয়া থেকে বিতাড়িত করে 1951 খ্রিঃ 8 ই জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওল দখল করে নেয় । পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠলে ম্যাক আর্থারকে 1951 খ্রিঃ পদচ্যুত করা হয় ।
যুদ্ধ বিরতি : ম্যাকআর্থারের পদচ্যুতির মাধ্যমে আমেরিকা জানান দিয়েছিল যে তারা চিনের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না । ফলে অবস্থার বা পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে । 1951 খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে রাশিয়া উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া ও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। এর পর দীর্ঘ আলোচনা মাধ্যমে 1953 খ্রিঃ উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পানমুনজম-এ উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে -
i) 38° অক্ষরেখা বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রসীমা নির্ধারিত হয়।
ii) যুদ্ধ বন্দিদের 60 দিনের মধ্যে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
iii) ভারতের সভাপতিত্বে একটি নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে বন্দির বিনিময়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় ।
গুরুত্ব : আপাত দৃষ্টিতে কোরিয়ার যুদ্ধ একটি নিরর্থক যুদ্ধ হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী ।
প্রথমত : দুই কোরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যকে এই যুদ্ধ পূরণ করতে পারেনি। বরং দুই কোরিয়ার বিভাজন মোটামুটি স্থায়ী বলে বিবেচিত হয়েছিল ।
দ্বিতীয়ত : দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে দুই কোরিয়াকে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল। যাকে প্রচুর অর্থসহ মানব সম্পদের ধ্বংসের ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়েছিল।
তৃতীয়ত : কোরিয়ার যুদ্ধের ফলে পশ্চিম ইউরোপে চলমান ঠাণ্ডা লড়াই এশিয়াতে প্রবেশ করেছিল ।
চতুর্থত : জাতিপুঞ্জের মর্যাদা বহুলাংশে ক্ষুন্ন হয়েছিল ।
পঞ্চমত : কোরিয়াকে কেন্দ্র করে চিনকে দুর্বল করার যে উদ্যোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল তা ব্যর্থ হয় এবং মার্কিন চিন বিরোধ বৃদ্ধি পায় ও চিনরাশিয়া সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সর্বোপরি বিভিন্ন সামরিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে এবং কোরিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সাম্যবাদ বিরোধী নীতিতে পরিণত হয়।
আরো পড়ুন:-ট্রুম্যান নীতি কি? মার্শাল পরিকল্পনার উদ্দেশ্য লেখ? CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন