ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা কর।
উত্তর:- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ গণআন্দোলন হলো 42 এর বিপ্লব বা আগস্ট আন্দোলন বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন। সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতে এত বড় গণ-আন্দোলন ইতিপূর্বে গড়ে ওঠেনি। জওহরলাল নেহেরুর মতে " It was essentially spontaneous mass upheaval..."
পটভূমি:- 1942 খ্রিস্টাব্দের ভারতছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি বা কারণগুলি হল:-
1. নিত্যপয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি:-
1939 খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাবও ভারতে পরে। ভারতের খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
2. ভারতের স্বাধীনতা স্পৃহা:-
অসহযোগ আন্দোলন,আইন অমান্য আন্দোলন শহরবাসীদের পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করেছিল যার ফলে একটা সর্বভারতীয় গণ আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।
3. ব্রিটিশ শোষন ও পীড়ন:-
বহুদিন ধরে ব্রিটিশ শোষন ও শাসনে বিরক্ত ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল।
4. ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতা:-
সর্বোপরি ক্লিপস প্রস্তাবে ভারতকে স্বাধীনতা দানের কোন উল্লেখ না থাকায় এই প্রস্তাব ব্যর্থ হলে ভারতীয়দের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা এক লহমায় মিলিয়ে গিয়ে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ:- 1942 খ্রিস্টাব্দের 14 ই জুলাই কংগ্রেসের কার্যনির্বাহক সমিতি ওয়ার্ধায় ভারতছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। 8 ই আগস্ট বোম্বাইএ সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি ভারতছাড়ো প্রস্তাব করলে ওই দিন রাত্রে মহাত্মা গান্ধী, আবুল কালাম আজাদ কংগ্রেসের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের পুলিশ গ্রেফতার করে এবং কংগ্রেসকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। ফল স্বরুপ মহাত্মা গান্ধী দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন " We shall either free india or die in the attempt." গান্ধীজীর এই ঘোষণায় 9 আগস্ট সমগ্র ভারতবাসী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
আন্দোলনের প্রকৃতি:-
সভা-সমিতি শোভাযাত্রা ও হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে ভারতবাসী তাদের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। এই আন্দোলনে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক শ্রেণী ও মহিলারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তমলুকে 73 বছর বয়সে গান্ধী বুড়ি মাতঙ্গিনী হাজরা, অসমীয়া কনকলতা বড়ুয়া আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেয়।
আন্দোলনের প্রসার:-
এই আন্দোলন প্রথমে বোম্বাই,আমেদাবাদ, পুনা কলকাতা, নাগপুর, কানপুর সহ বিভিন্ন শহরে শুরু হয় বাংলার মেদিনীপুরের তমলুকে গঠিত হয় স্বাধীন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার বিহারের মুঙ্গেরএ, ভাগলপুর, যুক্ত প্রদেশের বালিয়া, সুলতানপুর, উড়িষ্যার বালেশ্বর প্রভৃতি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মূল কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
নেতৃবৃন্দ:-
1916 দল যুগান্তর দল ও কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সর্বভারতীয় নেতাদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাম মনোহর লোহিয়া, অরুনা আশরাফ আলী প্রমূখ।
সরকারের দমননীতি:-
আন্দোলন দমনের জন্য সরকার নিষ্ঠুর ভাবে দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করে সরকারি হিসাব থেকে জানা যায় পুলিশ 538 ঠিক জায়গায় গুলি চালিয়ে 1028 জনকে হত্যা ও 3000 জনকে আহত করে। যদিও বেসরকারি মতে এ সংখ্যা ছিল আরো বেশী।
ব্যর্থতার কারণ:-
এই আন্দোলন ভারতের জনসাধারণের মধ্যে যে পরিমাণ ব্যাপকতা অর্জন করেছিল সেই তুলনায় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি কারণ:-
1. ব্রিটিশদের মতো প্রবল রাজ শক্তির দমন নীতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনগণের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর ছিল না।
2. নেতৃত্ব ও সংগঠন ও তার জন্য আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
3. আন্দোলনে সংহতি ও সমন্বয় শক্তির অভাব ছিল।
4. সর্বোপরি কমিউনিস্ট পার্টি,মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি বৃহৎ দল এই আন্দোলনে যোগদান না করায় তা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
গুরুত্ব:-
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ভারত ছাড়া আন্দোলন সাময়িক ব্যর্থ হলেও তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে ছিল আন্দোলনের গুরুত্ব গুলি হল:-
1. ওই আন্দোলন প্রমাণ করেছিল যে জনগণের মনে কংগ্রেসের প্রভাব গভীর।
2. মানুষ যে স্বাধীনতার জন্য সব কিছু হারাতে রাজি তাও বুঝতে পেরেছিল।
3. এই আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার হস্তান্তর কে চূড়ান্ত করেছিল।
4. ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে দেশব্যাপী যে জাতীয় জাগরণ ও ঐক্যবোধ গঠিত হয় তা স্বাধীনতার সোপান রচনা করেছিল।
5. এই আন্দোলন ছিল প্রকৃত অর্থে এক গণ বিপ্লব এবং সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক।
মূল্যায়ন:-
ভারত ছাড়ো আন্দোলন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছিল। ইউরোপের বুকে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন সারা ভারত জুড়ে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বিশ্ব রাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবশেষে অধ্যাপক তরুণ ভূঁইয়ার কথায় বলতে পারি "এই আন্দোলনের ফলে একটি অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ ও জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে এবং এর ফলে 1947 খ্রিস্টাব্দে ভারত ত্যাগে ইংরেজরা বাধ্য হয়।"
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন